রাজবাড়ীতে তথ্য জালিয়াতি করে শিক্ষার্থী ভর্তি ও টিসি প্রদানের অভিযোগ
- প্রকাশের সময় : ১২:৩৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / 28
সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি, অর্থের বিনিময়ে তথ্য জালিয়াতি এবং অভিভাবককে না জানিয়েই বিদ্যালয়ের ছাড়পত্র (টিসি) প্রদানের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পাংশা উপজেলার ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে রাজবাড়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৃথক তিনটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবক মোফাজ্জেল হোসেন। তবে অনুসন্ধানের সময় পর্যন্ত এ ঘটনার চূড়ান্ত কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সমাধান পাননি তিনি।
অভিযোগ সূত্রের বরাতে জানা যায়, মোফাজ্জেল হোসেনের মেয়ে আদৃতা রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির (প্রভাতী শাখা, রোল-৩৭) ছাত্রী। পারিবারিক বিশেষ কারণে পাংশায় অবস্থান করায় মেয়েটির পড়ালেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে স্থানীয় ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠে তাকে অস্থায়ীভাবে ক্লাস করার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে গোপনে শিক্ষার্থীটিকে ভর্তি করে নেন। পরবর্তীতে অভিভাবক বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পরবর্তীতে অভিভাবকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক ওই নামে কোনো শিক্ষার্থী তার বিদ্যালয়ে ভর্তি নেই বলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করেন।
এদিকে গত ১৩ মে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক প্রতিবেদককে জানান, শিক্ষার্থীটি তাঁর বিদ্যালয়ে ভর্তি আছে এবং পূর্বের প্রধান শিক্ষক তাকে ভর্তি করে গিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, পূর্বের প্রধান শিক্ষক গত মার্চ মাসে অবসরে যান, অথচ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির হাজিরা খাতায় দেখা যায় মে মাসে মেয়েটিকে ভর্তি করা হয়েছে এবং জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার হাজিরা রয়েছে। পরবর্তীতে অনিয়ম ঢাকতে হাজিরা খাতার ৬০ নম্বর ক্রমিক থেকে শিক্ষার্থীটির নাম ‘ফ্লুইড’ (সাদা কালি) দিয়ে মুছে সেখানে ইংরেজিতে ‘T.C’ লিখে রাখা হয়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এটিকে সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত বলে নিশ্চিত করেছেন।
পরবর্তীতে এই বেআইনি প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে গত ১৬ জুন রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাত্র অষ্টম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীর আবেদনে টিসি ইস্যু করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী অভিভাবকের আবেদন ছাড়া কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়ার সুযোগ নেই। এই টিসি দেখিয়ে পরবর্তীতে ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠে শিক্ষার্থীটিকে পুনর্ভর্তি দেখানো হয়। রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক খালেদা পারভীন ও অফিস সহকারী হাসানের যোগসাজশে ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই জালিয়াতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবকের।
অভিযোগকারী মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গত বছর একদল সন্ত্রাসী আমাকে অপহরণ করে নির্যাতন চালায়। সেই নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমি পাংশায় সরাসরি না গিয়ে ফোনে ও রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সদর আলীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করি। কিন্তু তারা আমাকে সহযোগিতা করেননি। আমাকে না জানিয়ে টিসি ইস্যুর নথি দেখতে চাইলে অফিস সহকারী হাসান প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ অমান্য করে তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, আমার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পাংশা শিক্ষা অফিসে তদন্ত পাঠানো হলেও অভিযোগকারী হিসেবে আমার কোনো বক্তব্য বা মতামত নেওয়া হয়নি।
অনিয়মের বিষয়ে রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সদর আলী জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগের বিষয়টি অফিশিয়ালি জবাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ বি এম আব্দুল হান্নান বলেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে বিষয়টির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তে অভিযোগকারীর মতামত না নেওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি। ছাড়পত্র ছাড়া মে মাস থেকে হাজিরা খাতায় নাম তুলে ক্লাস করানোর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি দাবি করেন, মানবিক কারণে হয়তো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্লাস করার সুযোগ দিয়েছিল।
রাজবাড়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বলেন, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কেবল একজন শিশু শিক্ষার্থীর আবেদনে টিসি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখানে সম্পূর্ণ অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। অভিভাবকের দেওয়া তিনটির মধ্যে একটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং একটি নিষ্পন্ন হয়েছে। শেষ অভিযোগটির তদন্ত চলছে, তদন্ত প্রতিবেদন পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়টি একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হওয়ায় ঘটনাটি জানা সত্ত্বেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে অভিভাবক মহাপরিচালক (শিক্ষা) বরাবর একটি অভিযোগ দিলে তারা এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেন।





















