জাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের পোস্টার, উদ্বেগে শিক্ষার্থীরা
- প্রকাশের সময় : ১১:১৮:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
- / 19
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতার নামে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। রাতের আঁধারে সাঁটানো এসব পোস্টারকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘প্রহসনের বিচার’ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই নিষিদ্ধ সংগঠনটি এমন তৎপরতা চালানোর সাহস পাচ্ছে বলে অভিযোগ করছে ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে, কর্মচারীদের জন্য নবনির্মিত আবাসিক টাওয়ারের সংলগ্ন এলাকায়, প্রান্তিক গেইট এলাকার বৈদ্যুতিক খুঁটিতে এবং বিশমাইল গেইট এলাকার যাত্রী ছাউনিসহ বেশ কিছু জনাকীর্ণ স্থানে এই পোস্টারগুলো টাঙানো হয়েছে।
পোস্টারগুলোতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক মো. সোহেল রানার নাম ও উদ্যোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে- ‘গোপালগঞ্জ গণহত্যার ১ বছর পূর্তি’, ‘এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের উপর গণহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই’, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রহসনের রায় অনতিবিলম্বে বাতিক করতে হবে, সকল মিথ্যা মামলা পরিহার করতে হবে’।
নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন নেতার নাম উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এভাবে প্রকাশ্যে পোস্টারিং করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম বলেন, “৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগকে যখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তখন ক্যাম্পাসের ভেতরে এতগুলো পয়েন্টে কীভাবে পোস্টার লাগানো হলো? আমরা মনে করেছিলাম ক্যাম্পাস এখন নিরাপদ, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের আবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগাচ্ছে।
ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এই তৎপরতার পেছনে প্রশাসনের গাফিলতি ও ‘ফ্যাসিস্টদের দোসরদের’ ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন।
জাবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, “দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত কোন সংগঠনের রাজনীতি করার কোন সুযোগ নাই। আমরা দেখেছি ছাত্রলীগ কীভাবে শিক্ষার্থীদের উপর গণরুম, গেস্টরুম কালচারের মাধ্যমে অত্যাচার করতো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের উপর কীভাবে নৃশংস হামলা চালিয়েছে আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। তাই তাদের প্রতিরোধে ছাত্রদল বদ্ধপরিকর।”
প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো ফ্যাসিস্টের দোসররা বসে আছে। তারাই ছাত্রলীগকে সকল খবর জানিয়ে দিচ্ছে। তাই ছাত্রলীগ রাতের আঁধারে এরকম তৎপরতা করার সুযোগ পাচ্ছে।”
একই প্রসঙ্গে জাবি ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ও জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি বেশ কিছুদিন ধরেই ক্যাম্পাসে নারী হেনস্তার চেষ্টাসহ বেশ কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে প্রশাসনের কাছে বারংবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ক্যাম্পাসের স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকা থেকে প্রান্তিক-বিশমাইল এলাকাগুলো অরক্ষিত রয়ে গেছে। এছাড়াও ক্যাম্পাসের সীমানাপ্রাচীর সংস্কারে প্রশাসনের গাফিলতি লক্ষ্য করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের দোসররা ঘাপটি মেরে বসে থাকায় ছাত্রলীগ কোন প্রকার বাধা ছাড়াই ক্যাম্পাসে তৎপরতা চালাতে পারছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতি শীঘ্রই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ আশা করছি।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা ও পূর্ববর্তী নমনীয় সিদ্ধান্তের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রশক্তি।
জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না যেখানে ছাত্রলীগের রাজনীতি সারা দেশেই নিষিদ্ধ। এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে নানা জায়গায় ছাত্রলীগের এই ধরনের পোস্টারিং খুবই উদ্বেগজনক।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি এখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পোস্টার সাঁটানোর সুযোগ পেয়েছে মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের উপর হামলার বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা প্রহসনের বিচারের কারণে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যাচেষ্টার বিপরীতে হামলাকারী ছাত্রলীগ বা হামলায় মদদদাতা আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের নামমাত্র বিচার হয়েছে। যার ফলে নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এই ধরনের কাজ করার সাহস পাচ্ছে।”
জাবি ছাত্রশক্তির সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, “কিছুদিন আগেও দেখেছি ছাত্রলীগ ডেইরি গেইটে মানববন্ধন করেছে। আমরা প্রশাসনকে মামলা করতে বলেছিলাম কিন্তু প্রশাসন কোন গুরুত্ব দেয়নি। তাই নতুন করে আবারও পোস্টার লাগানোর সুযোগ পেয়েছে ছাত্রলীগ। প্রশাসনের ব্যর্থতা ও কিছুদিন আগে সিন্ডিকেটে ছাত্রলীগের ১৬ হামলাকারীকে দায়মুক্তি দেওয়ার কারণেই এসব ঘটনা বার বার ঘটছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকাগুলোতে ছাত্রলীগ ঘাঁটি গেড়েছে এবং প্রশাসন ও নিরাপত্তা দপ্তরে থাকা ফ্যাসিস্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা উচিত।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “পোস্টারগুলো নজরে আসার পরপরই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করব, তারা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে তিনি বলেন, “ছাত্রলীগের এ ধরনের কর্মকান্ড নির্মূল করতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা কাম্য।”

























