থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ হোক, আগামীর অঙ্গীকার
- প্রকাশের সময় : ০৩:৫৮:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
- / 19
থ্যালাসেমিয়া শুধু শারীরিক ক্ষেত্রেই নয় বরং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বিপর্যয়ে একটি নীরব ঘাতক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৩% এর অধিক মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। এ সকল ব্যক্তির সংখ্যা আনুমানিক ২ কোটিরও বেশি। কোনো কারণে এই থ্যালাসেমিয়া জিন বাহকদের একে অপরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে, এদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ২৫% জেনারেশন থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়। সেই হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ হাজার নতুন শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। এবং প্রতি বছর এই সংখ্যা, বিগত বছরের সংখ্যার সাথে যোগ হয়ে যাচ্ছে। এমনি করে বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৮০ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর প্রতি মাসে রক্ত নিতে হয়।
এই অসুখে দেখা যায়, স্বাভাবিক লোহিত কণিকা তার নির্দিষ্ট ১২০ দিন লাইফ স্প্যানের অনেক আগেই এর মেমব্রেন বা ঝিল্লি বিভিন্ন কারণে একা একাই ভেঙে পড়ে। লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার ফলে, এর মধ্যে অবস্থিত হিমোগ্লোবিন ভেঙে হিম এবং গ্লোবিন আলাদা হয়ে যায়। এতে করে শরীরে আয়রনের উপস্থিতি বেড়ে যায় এবং গ্লোবিন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বিলিরুবিনে পরিণত হয়। ফলে উক্ত ব্যক্তির শরীরে রক্তশূন্যতা এবং জন্ডিস দেখা দেয়। সাধারণত এ সকল বাচ্চারা অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে, ক্লান্তি আর অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ কমে যায়। হাড়ের পরিবর্তন দেখা যায়। চোখ ও প্রসাবের রং হলদেটে হয়ে যায়।
এ সকল রোগীদের প্লীহা (Spleen) বড় হয়ে যায়, এবং এই বড় হয়ে যাওয়া প্লীহার মাঝ দিয়ে যখন লোহিত রক্তকণিকা অতিক্রম করে, তখন আবারও এই অস্বাভাবিক রক্তকণিকার মেমব্রেন ভাঙার হার আরও বেড়ে যায়। একসময় এই প্লীহাও কেটে ফেলতে হয়। প্লীহা কেটে ফেললে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এ সকল রোগীদের ঘন ঘন ইনফেকশন হয়। অর্থাৎ এই রোগ থেকে আর নিস্তার নাই।
অপরিণত রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে যাওয়াতে এবং একই সাথে রক্তশূন্যতার কারণে, অন্যের রক্ত গ্রহণ করাতেও শরীরে আয়রনের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এক সময় শরীরের এই অতিরিক্ত আয়রন, লিভার, ব্রেন, কিডনি সহ বিভিন্ন স্থানে জমতে থাকে। ফলে জটিলতা কেবল বাড়তেই থাকে।
এক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে, একজন রোগীর, রক্তদাতার ব্লাড গ্রুপিং, স্ক্রিনিং টেস্ট, ক্রস ম্যাচিং পরীক্ষা, রক্তদাতার যাওয়া-আসার ভাড়া, অন্তত একবেলার লাঞ্চের বিল, রোগী ও তার পরিবারের যাওয়া-আসার ভাড়া, রোগীর হাসপাতালে উপস্থিত থাকার সময়ের খরচ, সবকিছু মিলে এক ব্যাগ বিনামূল্যে রক্ত নিতে গেলেও প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এরকমভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মাসের পর মাস রক্ত নিতে হয়।
শরীরের অতিরিক্ত আয়রন কমানোর জন্য, এই আয়রন চিলেটিং ওষুধ বাংলাদেশের সব অঞ্চলে অ্যাভেইলেবল নয়, দামও অনেক বেশি। প্রায় ক্ষেত্রেই এ সকল খরচের ভার, রোগীদের আয়ত্তের বাইরে। ফলে শারীরিক অসুবিধার সাথে সাথে পরিবারের আর্থসামাজিক জটিলতা দিনের পর দিন বাড়তেই থাকে। মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্নবিত্ত পরিবারে পরিণত হয়। তাদের জীবনের লাল-নীল বর্ণগুলো বিদঘুটে আকার ধারণ করে।
সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় হলো, এ সকল বাচ্চারা প্রায়ই অসুস্থ থাকার কারণে, স্কুল থেকে ড্রপআউট হয়ে যায়, এবং তার বন্ধু-বান্ধবীদের কাছ থেকে পিছিয়ে পড়ে। এক সময়, লজ্জা, ভয় আর আতঙ্কে, স্কুলে আর যাওয়া হয় না, পড়াশোনাও আর শেষ হয় না। এ সকল পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদের জন্য আলাদাভাবে স্কুলের অতীব প্রয়োজন।
রক্তশূন্যতার কারণে এ সকল বাচ্চারা অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে। যদি আমরা এদেরকে কম্পিউটার, কোডিং, ফ্রিল্যান্সিং শেখানোর মাধ্যমে, স্বল্প পরিশ্রমের ক্রিয়েটিভ কাজ শেখাতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে এরা পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক হাল ধরাতে অবদান রাখতে পারে।
আমরা ফরিদপুর থ্যালাসেমিয়া ও হিমোফিলিয়া রুগী কল্যাণ কেন্দ্র, পশ্চিম খাবাসপুর, ফরিদপুর নামে একটি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের সকল স্তরে বিনামূল্যে সহযোগিতা করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
এই রোগ তখনই নির্মূল করা সম্ভব, যদি বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়ার নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা অর্থাৎ হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগের ক্যারিয়ার কিনা, এটা নিশ্চিত হওয়া, এবং কোনোভাবেই দুইজন ক্যারিয়ারের মাঝে বিবাহবন্ধন যাতে না হয়, সেটা আইন করে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
বিশ্বে মালদ্বীপের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশে, এই আইন বিদ্যমান থাকাতে, সেখানে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। আমরা স্কুলে রেজিস্ট্রেশনের সময় যখন ব্লাড গ্রুপ ম্যান্ডেটরি করেছি, ঠিক এমনি ভাবে, আমরা যদি থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষাটাও ম্যান্ডেটরি করি, এবং বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের সময় অবশ্যই দুইজনের রিপোর্ট বাধ্যতামূলক দেখাতে বলা হয়, তাহলে কেবল এই রোগটা নির্মূল করা সম্ভব।
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে, নতুন সরকারের নেতৃত্বে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, শক্তিশালী থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ তৈরি হোক, এই কামনা করি।
থ্যালাসেমিয়া ও হিমোফিলিয়া রুগী কল্যাণ কেন্দ্র, পশ্চিম খাবাসপুর, ফরিদপুর-এর পক্ষ থেকে, এ সকল উপসর্গজনিত ব্যক্তিদের আমাদের কাছে পাঠানোর জন্য অনুরোধ রইলো। এখানে বিনামূল্যে তাদের চিকিৎসা পরামর্শের পাশাপাশি, রক্তদাতাদের সাথে একটি মেলবন্ধন তৈরি করে দেওয়া হয়, পাশাপাশি আয়রন চিলেটিং ঔষধও বিনামূল্যে সংগ্রহের ব্যাপারে সহযোগিতা করা হয়।
মহান আল্লাহ বাংলাদেশের সকল পরিবারকে নিরাপদে রাখুন, সুস্থ রাখুন, থ্যালাসেমিয়া মুক্ত রাখুন।
লেখক: আরপি (মেডিসিন), ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ফরিদপুর বিএমএ।
























