Dhaka ১২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
ককরোচ পার্টির কর্মসূচি : দিল্লিতে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ আটক ১০০০ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, জড়িতদের খুঁজছে পুলিশ সিজেপিকে মোকাবিলায় নয়াদিল্লিতে ২৫ হাজার পুলিশ, ৩ শতাধিক ক্যামেরা বীথির মৃত্যু: সেবার পেশায় থেকেও অপচিকিৎসার বলি! বর্ণিল আয়োজনে শুরু ২ দিন ব্যাপী বাংলা উৎসব॥ সহস্রাধিক শিশ-কিশোরের ঊচ্ছ্বাস পানামায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, বড় বিপর্যয় ঘোষণা প্রেসিডেন্টের কুমিল্লায় তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন অটোরিকশাচালক সুমন: পুলিশ বিক্ষোভের আগের রাতে থমথমে দিল্লি, ট্রেনের পর ইন্টারনেটও বন্ধ ঘোষণা দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরলে দায় জামায়াতকে নিতে হবে: শামা ওবায়েদ সৌদি আরবে হুতিদের হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের নিন্দা
একটি মৃত্যু, একটি পরিবারের আজীবন কান্না, একটি শিশুর মাতৃহীন শৈশব—আর আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এক নির্মম প্রশ্ন

বীথির মৃত্যু: সেবার পেশায় থেকেও অপচিকিৎসার বলি!

সৌমিত্র শীল চন্দন
  • প্রকাশের সময় : ১১:২৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • / 3

মানুষকে সেবা দেওয়ার ব্রত নিয়ে নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন বীথি আক্তার। তাঁর কাজ ছিল অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যন্ত্রণাকাতর মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি ফোটানো। অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! সেই সেবার পেশায় থাকা ২৫ বছর বয়সী বীথিকেই শেষ পর্যন্ত লড়তে হলো নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অবহেলার মূল্য তাঁকে দিতে হলো নিজের জীবন দিয়ে। রেখে গেলেন এক নিষ্পাপ সন্তান, যে মাকে বলে ডাকার আগেই হারিয়ে ফেলল তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বীথি গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের মতো আনন্দময় মুহূর্তটি তাঁর জীবনে নতুন এক স্বপ্নের সূচনা করার কথা ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। নবজাতককে বুকে জড়িয়ে মাতৃত্বের পূর্ণতা অনুভব করার কথা ছিল যে মায়ের, সেই মা সন্তানকে কোলে পর্যন্ত নিতে পারেননি। দীর্ঘ ছয় মাস অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো তাঁকে।

বীথির মৃত্যু কেবল একজন তরুণীর চলে যাওয়া নয়। এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একজন স্বামীর জীবনসংগ্রামের নতুন অধ্যায়, আর একটি শিশুর অনিবার্য বঞ্চনার সূচনা। যে শিশু পৃথিবীতে এসেছিল মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নিয়ে, সে বড় হবে মায়ের স্পর্শহীনতায়। তার প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিন—জীবনের অসংখ্য মুহূর্তে মায়ের অনুপস্থিতি হয়ে উঠবে এক গভীর শূন্যতা। হয়তো একদিন সে জানতে চাইবে, তার মা কোথায়? তখন কী জবাব দেবে পরিবার? কীভাবে বোঝাবে, পৃথিবীর আলো দেখানোর পরও মা কেন তার পাশে থাকতে পারলেন না?

বীথির অসুস্থতার কারণে পুরো পরিবারকে যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার হিসাব কি কেবল চিকিৎসার খরচে মাপা যায়? দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, হাসপাতালের ছোটাছুটি, স্বজনদের উৎকণ্ঠা, কর্মক্ষম একজন মানুষের অসহায় হয়ে পড়া—এসবের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? আর শেষ পর্যন্ত যখন মৃত্যু এসে সব সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন কোনো ক্ষতিপূরণই কি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে?

এখানেই প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় কার? চিকিৎসকের? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের? নাকি এমন একটি ব্যবস্থার, যেখানে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়? তবে অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। চিকিৎসার প্রতিটি জটিলতা অবহেলা নয়, কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শরীরে গজ বা অন্য কোনো চিকিৎসাসামগ্রী থেকে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এর সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

চিকিৎসা মানুষের জীবন রক্ষার পেশা। এখানে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে ব্যবহৃত গজ, সুইসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর হিসাব নিশ্চিত করা, চিকিৎসার মান তদারকি করা, জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা—এসব কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; রোগীর জীবন রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

বীথির মৃত্যুর ঘটনায় তাই চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।

প্রশ্নটি শুধু বীথির নয়, আমাদের সবার। আজ বীথি, কাল হয়তো অন্য কেউ। আর কত জীবন ঝরে গেলে চিকিৎসায় অবহেলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আর কত শিশু মায়ের মুখ দেখার অধিকার হারালে আমরা বুঝব, চিকিৎসাসেবা কেবল পেশা নয়—এটি মানুষের জীবনের প্রতি এক গভীর অঙ্গীকার?

বীথি আর ফিরবেন না। তাঁর সন্তানও কোনো দিন মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। কিন্তু বীথির মৃত্যু যদি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দায়িত্বশীল করতে পারে, যদি একটি জীবনও ভবিষ্যতে এমন পরিণতি থেকে রক্ষা পায়, তবে সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি কিছুটা দায় শোধ করা সম্ভব।

বীথির মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। তাঁর মৃত্যুর প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই, জবাবদিহি চাই, পরিবর্তন চাই। কারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে মানুষ যেন মৃত্যুভয় নিয়ে নয়, সুস্থ হয়ে ফেরার আশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করতে পারে—এটাই তো আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশা।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনতার আদালত

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

একটি মৃত্যু, একটি পরিবারের আজীবন কান্না, একটি শিশুর মাতৃহীন শৈশব—আর আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এক নির্মম প্রশ্ন

বীথির মৃত্যু: সেবার পেশায় থেকেও অপচিকিৎসার বলি!

প্রকাশের সময় : ১১:২৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

মানুষকে সেবা দেওয়ার ব্রত নিয়ে নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন বীথি আক্তার। তাঁর কাজ ছিল অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যন্ত্রণাকাতর মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি ফোটানো। অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! সেই সেবার পেশায় থাকা ২৫ বছর বয়সী বীথিকেই শেষ পর্যন্ত লড়তে হলো নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর পেটের ভেতরে গজ রেখেই সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অবহেলার মূল্য তাঁকে দিতে হলো নিজের জীবন দিয়ে। রেখে গেলেন এক নিষ্পাপ সন্তান, যে মাকে বলে ডাকার আগেই হারিয়ে ফেলল তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বীথি গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের মতো আনন্দময় মুহূর্তটি তাঁর জীবনে নতুন এক স্বপ্নের সূচনা করার কথা ছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। নবজাতককে বুকে জড়িয়ে মাতৃত্বের পূর্ণতা অনুভব করার কথা ছিল যে মায়ের, সেই মা সন্তানকে কোলে পর্যন্ত নিতে পারেননি। দীর্ঘ ছয় মাস অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো তাঁকে।

বীথির মৃত্যু কেবল একজন তরুণীর চলে যাওয়া নয়। এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একজন স্বামীর জীবনসংগ্রামের নতুন অধ্যায়, আর একটি শিশুর অনিবার্য বঞ্চনার সূচনা। যে শিশু পৃথিবীতে এসেছিল মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার নিয়ে, সে বড় হবে মায়ের স্পর্শহীনতায়। তার প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিন—জীবনের অসংখ্য মুহূর্তে মায়ের অনুপস্থিতি হয়ে উঠবে এক গভীর শূন্যতা। হয়তো একদিন সে জানতে চাইবে, তার মা কোথায়? তখন কী জবাব দেবে পরিবার? কীভাবে বোঝাবে, পৃথিবীর আলো দেখানোর পরও মা কেন তার পাশে থাকতে পারলেন না?

বীথির অসুস্থতার কারণে পুরো পরিবারকে যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার হিসাব কি কেবল চিকিৎসার খরচে মাপা যায়? দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, হাসপাতালের ছোটাছুটি, স্বজনদের উৎকণ্ঠা, কর্মক্ষম একজন মানুষের অসহায় হয়ে পড়া—এসবের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? আর শেষ পর্যন্ত যখন মৃত্যু এসে সব সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন কোনো ক্ষতিপূরণই কি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে?

এখানেই প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় কার? চিকিৎসকের? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের? নাকি এমন একটি ব্যবস্থার, যেখানে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়? তবে অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। চিকিৎসার প্রতিটি জটিলতা অবহেলা নয়, কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শরীরে গজ বা অন্য কোনো চিকিৎসাসামগ্রী থেকে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এর সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

চিকিৎসা মানুষের জীবন রক্ষার পেশা। এখানে সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে ব্যবহৃত গজ, সুইসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর হিসাব নিশ্চিত করা, চিকিৎসার মান তদারকি করা, জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা—এসব কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; রোগীর জীবন রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

বীথির মৃত্যুর ঘটনায় তাই চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায় প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়।

প্রশ্নটি শুধু বীথির নয়, আমাদের সবার। আজ বীথি, কাল হয়তো অন্য কেউ। আর কত জীবন ঝরে গেলে চিকিৎসায় অবহেলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে? আর কত শিশু মায়ের মুখ দেখার অধিকার হারালে আমরা বুঝব, চিকিৎসাসেবা কেবল পেশা নয়—এটি মানুষের জীবনের প্রতি এক গভীর অঙ্গীকার?

বীথি আর ফিরবেন না। তাঁর সন্তানও কোনো দিন মায়ের কোলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। কিন্তু বীথির মৃত্যু যদি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও দায়িত্বশীল করতে পারে, যদি একটি জীবনও ভবিষ্যতে এমন পরিণতি থেকে রক্ষা পায়, তবে সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি কিছুটা দায় শোধ করা সম্ভব।

বীথির মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। তাঁর মৃত্যুর প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই, জবাবদিহি চাই, পরিবর্তন চাই। কারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়ে মানুষ যেন মৃত্যুভয় নিয়ে নয়, সুস্থ হয়ে ফেরার আশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করতে পারে—এটাই তো আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশা।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনতার আদালত