ধর্ষণের শাস্তি কোন দেশে কতটা কঠোর?
- প্রকাশের সময় : ০২:০৬:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
- / 29
ধর্ষণ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ধর্ষণের মামলা আগের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই শিশু এবং কন্যাশিশু। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে দেশে অন্তত ৬৪৩টি শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হয়েছে।
শুধু চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে ১৭ জনকে খুন করা হয়। সর্বশেষ রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশ, রাজপথে নেমেছে মানুষ।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণের বিচার চেয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, কেউ বলছেন ক্রসফায়ার আবার কেউ বলছেন প্রচলিত আইনে বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা।
বিশ্বজুড়ে ধর্ষণকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই অপরাধের শাস্তি দেশভেদে ভিন্ন— কোথাও মৃত্যুদণ্ড, কোথাও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আবার কোথাও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও শারীরিক শাস্তির মতো ব্যবস্থাও রয়েছে। অনেক দেশ সম্প্রতি জনরোষ ও সামাজিক চাপের মুখে তাদের আইন আরও কঠোর করেছে।
বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও বহাল রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়, যা চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন-২০২৫ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে তিনি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর পাশাপাশি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন। ধর্ষণের কারণে যদি কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীর জন্য শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে এবং ধর্ষণের কারণে ওই নারী বা শিশু আহত বা নিহত হলে, অপরাধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হলো ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর সঙ্গে অর্থদণ্ড।
বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও ধর্ষণের শাস্তি তুলনামূলকভাবে কঠোর হলেও ইউরোপের অনেক দেশ পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে শরিয়াভিত্তিক আইনে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তি দেওয়া হয়।
ভারতে সাধারণত ধর্ষণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা যাবজ্জীবন (সারাজীবন) পর্যন্ত হতে পারে। ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর ক্ষেত্রে ধর্ষণের শাস্তি কমপক্ষে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধীর আমৃত্যু কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানে ধর্ষণকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয় এবং এসব দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির রয়েছে। বিশেষ করে ইরানে ধর্ষণকে ‘হাদ্দ’ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
সৌদি আরবে ইসলামী শরিয়া আইনের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণিত হলে সাধারণত শিরশ্ছেদ (গর্দান কাটা) এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এছাড়া অপরাধের ধরণ এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচারকের বিবেচনায় দোররা মারা (চাবুক মারা) থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডও হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে দেশটির ফেডারেল দণ্ডবিধি অনুযায়ী বলপ্রয়োগ বা জোরপূর্বক ধর্ষণের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিশেষ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী যদি ১৪ বা ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু বা কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়, কিংবা ধর্ষণের কারণে যদি ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীর জন্য মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়।
ইরানে জোরপূর্বক ধর্ষণের (জিনা-বি-অনফ) শাস্তি হিসেবে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে যদি ভুক্তভোগী বা তার পরিবার ধর্ষককে ক্ষমা করে দেয়, তবে অপরাধী মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে মোহরানার সমপরিমাণ নির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতিপূরণ (জিরাহ) দিতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড বা দোররা ভোগ করতে হয়।
চীনে বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্যান্য উপায়ে কোনো নারীকে ধর্ষণ করলে অপরাধীকে ৩ থেকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। দেশটির ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়া চীনে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে সরাসরি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো সম্মতি বিবেচনা করা হয় না এবং অপরাধীকে সাধারণ সাজার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
উত্তর কোরিয়ায় শাস্তির বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশেই ধর্ষণের সর্বনিম্ন সাজা ৩ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড, যা অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
জাপানে জোরপূর্বক বা সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কের সর্বনিম্ন সাজা ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, যা সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগী আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা মারা গেলে অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৩ সালে ঐতিহাসিক আইনি সংস্কারের মাধ্যমে জাপানে সম্মতির বয়স ১৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়েছে। ফলে ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা সরাসরি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। জাপানের সংশোধিত আইন অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী উভয়ই ধর্ষণের শিকার হিসেবে আইনি সুরক্ষা পান।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৯৭ নম্বর ধারা এবং যৌন অপরাধ দমন সংক্রান্ত বিশেষ আইন অনুযায়ী বিচার করা হয়। বলপ্রয়োগ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ধর্ষণের শাস্তি সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কোরিয়ান আইনে এই অপরাধে কোনো জরিমানার বিধান নেই, সরাসরি কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ধর্ষণের সময় ভুক্তভোগী সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হলেও অপরাধীর সাজা কঠোর হয়ে সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হয়। ভুক্তভোগী ১৯ বছরের কম বয়সী হলে সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ভুক্তভোগী যদি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশু হয়, তবে অপরাধীকে সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাদণ্ডের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় দোষী সাব্যস্ত অপরাধীদের নাম ও ছবি পাবলিক ডেটাবেজে প্রকাশ করা হয়, পায়ে ইলেকট্রনিক ট্র্যাকিং ব্রেসলেট পরানো হয় এবং শিশুসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিষিদ্ধ করা হয়।
সিঙ্গাপুরে ধর্ষণের শাস্তি ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, সঙ্গে বেত্রাঘাতের বিধানও রয়েছে, যা এশিয়ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে কঠোর শাস্তি হিসেবে বিবেচিত।
ইন্দোনেশিয়ায় ফৌজদারি বিধি (আর্টিকেল ২৮৫) অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিয়ের বাইরে কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী অচেতন বা অবশ থাকা অবস্থায় কেউ যৌন নিপীড়ন করলে তার সাজা সর্বোচ্চ ৯ বছরের কারাদণ্ড। ইন্দোনেশিয়ায় শিশুদের (১৮ বছরের কম বয়সী) ওপর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন অত্যন্ত কঠোর। শিশু ধর্ষণের সর্বনিম্ন সাজা ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড।
যদি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগী থাকে, ভুক্তভোগী গুরুতর জখম বা মানসিকভাবে বিকৃত হয়, কিংবা ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়াও ২০১৬ সালে পাস হওয়া একটি বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া শিশু ধর্ষকদের জন্য রাসায়নিক খোঁজাকরণ বা লিঙ্গচ্ছেদ আইন চালু করে। এটি একটি হরমোন থেরাপি যা ইনজেকশনের মাধ্যমে অপরাধীর শরীরে পুশ করা হয়, যা তার যৌন আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষমতা পুরোপুরি দমন করে।
মূল কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত অপরাধীর ওপর এই অতিরিক্ত শাস্তি কার্যকর রাখা হয়। তবে ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো অপরাধীর ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হয় না। ইন্দোনেশিয়ার নতুন দণ্ডবিধি সংস্কারের মাধ্যমে বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীর অমতে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তার সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
কারাদণ্ড ও রাসায়নিক খোঁজাকরণ ছাড়াও আদালত অপরাধীর নাম, ছবি এবং পরিচয় জনসমক্ষে সরকারিভাবে প্রকাশ, কারাগার থেকে মুক্তির পর পায়ে ইলেকট্রনিক ট্র্যাকিং ডিভাইস পরা বাধ্যতামূলক এবং ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে বাধ্যতামূলক আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারে।
ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্ষণের শাস্তি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে শাস্তি ভিন্ন হলেও সাধারণত ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে এবং যৌন অপরাধীদের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
কানাডা ও যুক্তরাজ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও শাস্তি নির্ধারণে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনি ব্যবস্থা ফেডারেল (কেন্দ্রীয়) ও স্টেট (অঙ্গরাজ্য) এই দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় ধর্ষণের সংজ্ঞা, সাজার ধরণ এবং মেয়াদ একেক রাজ্যে একেক রকম হয়ে থাকে। দেশটির কেন্দ্রীয় আইনে সরাসরি ‘ধর্ষণ’ শব্দের বদলে অপরাধটিকে ‘যৌন নিপীড়ন’ ক্যাটাগরিতে বিচার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের অপরাধের ধরণ অনুযায়ী জরিমানা থেকে শুরু করে কয়েক দশক বা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের গড় কারাদণ্ডের সময় সাধারণত ১৯ বছর (২২৯ মাস) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস বা আলাবামার মতো রাজ্যগুলোতে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণত ৮ থেকে ২০ বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। ভুক্তভোগী যদি শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তবে সাজা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ থেকে ৪০ বছর বা প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
এছাড়া ভুক্তভোগীকে অচেতন বা কাবু করার জন্য কোনো ড্রাগ বা মাদক ব্যবহার করা হলে সাজা আরও ১০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কারাদণ্ড ভোগ করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে একজন যৌন অপরাধীকে দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। সাজা শেষে মুক্তি পাওয়ার পর অপরাধীকে বাধ্যতামূলকভাবে স্টেট ও জাতীয় ডেটাবেজে নাম ও ছবি নিবন্ধন করতে হয়। এই তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে, যার ফলে অপরাধী সহজে চাকরি বা থাকার জায়গা পায় না।
এসব শাস্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারের ভেতরে বা প্যারোলে থাকা অবস্থায় অপরাধীকে নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা বা যৌন অপরাধ সংশোধন থেরাপি নিতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধর্ষণের ঘটনায় যদি ভুক্তভোগীর মৃত্যু না ঘটে বা অপরাধীর হত্যার উদ্দেশ্য না থাকে, তবে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না। তবে ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হলে তা ‘ক্যাপিটাল মার্ডার’ হিসেবে গণ্য হয় এবং সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর হতে পারে।
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়ায়ও ধর্ষণের শাস্তি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, যেখানে সহিংসতা, শিশু জড়িত থাকা বা সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও বাড়ানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র শাস্তির কঠোরতা নয়, বরং দ্রুত বিচার, শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। অনেক দেশ কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তি এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।
সর্বোপরি, বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান কঠোর হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ ও বিচারিক কার্যকারিতা দেশভেদে ভিন্ন। কোথাও মৃত্যুদণ্ড, কোথাও বেত্রাঘাত, আবার কোথাও আজীবন কারাবাস—কিন্তু লক্ষ্য একটাই, যৌন সহিংসতা দমন এবং সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


























