সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগেই নিউজিল্যান্ড শিবিরে জোড়া ধাক্কা চুক্তি না হলে সামরিক অভিযানে দ্রুতই ইরান যুদ্ধের ইতি: ট্রাম্প আজ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন শুরু শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চলছে: রিজভী জাবির তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের নতুন পরিচালক অধ্যাপক মানছুর নওগাঁয় আন্ত:জেলা মোটরসাইকেল চোর চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার মিরপুরে সংঘর্ষ-আগুন, চার মামলায় আসামি সাড়ে ১০ হাজার বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বাণিজ্য মেলার প্রধান ফটক ভেঙে ক্যাম্পাসে ফিরলেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য : প্রতিমন্ত্রী
স্মৃতির অর্ঘ্য

দেবাহুতি চক্রবর্তী: একজন মানুষ, বহুমাত্রিক সত্তা

সৌমিত্র শীল চন্দন
  • প্রকাশের সময় : ০১:৪৫:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / 16

তিনি নিজেকে সব সময় ্আড়ালেই রাখতে চাইতেন। অন্তত আমাদর সমাজ বাস্তবতায় প্রচারবিমুখ মানুষের সংখ্যা নেহায়েতই কম। তিনি তাদেরই একজন। আমরা সবাই তাকে সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে জানি। আইন পেশায় নিয়োজিত থাকায় নামের সঙ্গে ‘অ্যাডভোকেট’ উপাধিটি যুক্ত হয়েছে। এর বাইরেও তিনি নীরবে নিভৃতে কত কাজ করে গেছেন। ছিলেন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। কতবার দেখেছি, যে কথা বলার সাহস কেউ পেতেন না, সেই কথাই তিনি নির্ভয়ে, দ্বিধাহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। অন্যায়, অনিয়ম কিংবা অসংগতির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ কখনো থেমে থাকেনি। সত্যকে সত্য, আর অন্যায়কে অন্যায় বলার অসাধারণ সাহস ছিল তাঁর। পদ-পদবি, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা কারও বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে কখনো সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাঁর স্পষ্টবাদিতা কখনো কারও কাছে অপ্রিয় হয়েছে, আবার অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে সাহস ও প্রেরণার উৎস। এমন মানুষ কেবল নিজের অবস্থান থেকেই কথা বলেন না, কথা বলেন বিবেকের তাড়নায়, মানুষের পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে। তিনি অ্যাডভোকেট দেবাহুতি চক্রবর্তী।
সময়ের পরিক্রমায় তাঁর বলা কথাগুলোই বারবার মনে করিয়ে দেয়—সাহস করে সত্য উচ্চারণ করাও একধরনের দায়বদ্ধতা, একধরনের সংগ্রাম।
ক্ষুরধার লেখনী আর অসাধারণ শব্দচয়নের প্রতিভা ছিল তাঁর সহজাত। খুব বেশি লিখতেন না তিনি, কিন্তু যখনই লিখতেন, প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠত গভীর চিন্তা, প্রখর বিশ্লেষণ আর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর। তাঁর লেখার পরিমাণ নয়, গভীরতাই ছিল বড় পরিচয়। অল্প কথায় অনেক কিছু বলে দেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর প্রতিটি লেখা পাঠককে ভাবতে শেখাত, উপলব্ধির নতুন দরজা খুলে দিত। সত্যকে শাণিত শব্দে তুলে ধরার যে অসামান্য দক্ষতা তাঁর ছিল, তা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছিল। তিনি হয়তো নিয়মিত লিখতেন না, কিন্তু যখনই কলম ধরতেন, সৃষ্টি করতেন এমন কিছু, যার রেশ থেকে যেত পাঠকের মনে।
একটা উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে। রাজবাড়ী জেলা প্রেসক্লাবের স্মরণিকা ‘অক্ষর’ এর জন্য তাঁর কাছে লেখা চাইলাম। প্রথমে দিতেই চাইলেন না। আমি নাছোরবান্দা। লেখা নিয়েই ছাড়লাম। যে লেখাট তিনি দিলেন, তা ছিল অসাধারণ। দাদা ঠাকুর শরৎচন্দ্র পন্ডিত নামে যে এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক ছিলেন তা আমার জানা ছিলনা। দাদা ঠাকুরকে নিয়ে লেখাটি ছিল অসাধারণ। ১৮৮১ সালে জন্ম নেওয়া দাদাঠাকুর ১৯৬৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের নানা বাঁক, সেই সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, সাংবাদিক হয়ে ওঠার পেছনের গল্প এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম—সবকিছুই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন লেখাটিতে। ইতিহাসের তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি একজন মানুষের জীবনসংগ্রামকে কীভাবে জীবন্ত করে তুলতে হয়, তা তাঁর লেখা না পড়লে হয়তো উপলব্ধিই করতে পারতাম না।
সেদিন আবারও উপলব্ধি করেছিলাম, কেন তাঁকে আমি ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী বলি। তিনি হয়তো নিয়মিত লিখতেন না, কিন্তু লিখতে বসলে বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করতেন। তাঁর লেখায় থাকত অনুসন্ধান, ইতিহাসবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর উপস্থাপনার অনন্য মুন্সিয়ানা। অল্প লেখার মধ্য দিয়েও যে অসাধারণত্বের স্বাক্ষর রাখা যায়, দাদাঠাকুরকে নিয়ে তাঁর সেই লেখাটি ছিল তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাজবাড়ীর শিশুরা যেন সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য, নাটক ও সৃজনশীলতার প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে—এই স্বপ্ন থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশু সংগঠন ‘আবোলতাবোল’। যত দিন সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন, তত দিন প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন সংগঠনটিকে সচল ও গতিশীল রাখতে। তাঁর আন্তরিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা আর নিরলস প্রচেষ্টায় আবোলতাবোল হয়ে উঠেছিল রাজবাড়ীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক পরিচিত নাম। সংগঠনটির নানা আয়োজন ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য। এসব আয়োজন সফল করে তুলতে তাঁর ছিল নিজস্ব কৌশল, বিচক্ষণতা এবং মানুষকে সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতা।
মনে পড়ে, আবোলতাবোল শিশু সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদের একটি নাটকের মহড়া চলছিল। মহড়ায় একজন অভিনয়শিল্পী বারবার ভুল করছিলেন। তাঁর নামটি এখন আর মনে নেই। টানা দুই-তিন দিন তিনি বিষয়টি লক্ষ করলেন। কিন্তু অভিনয়ে কোনো উন্নতি দেখা গেল না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো বিরক্ত হতেন, সরাসরি ধমক দিতেন কিংবা অপারগতার কথা বলে দিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। কাউকে বিব্রত না করে, তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত না দিয়ে, অত্যন্ত কৌশলে বললেন, ‘তোমার চেষ্টাটা অসাধারণ। কিন্তু অন্য কেউ চরিত্রটা করলে নাটকের জন্য ভালো হবে।’
কথাটির মধ্যে ছিল একদিকে চেষ্টা ও আন্তরিকতার স্বীকৃতি, অন্যদিকে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার কোমল ইঙ্গিত। কাউকে ছোট না করে, তাঁর মন ভেঙে না দিয়ে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত কীভাবে জানাতে হয়, সেই প্রজ্ঞা তাঁর ছিল। সাংগঠনিক দক্ষতা কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা মানুষকে একত্র করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষকে বোঝা, তার অনুভূতির মর্যাদা দেওয়া এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেও তার পরিচয় মেলে। তিনি এসব গুণের অধিকারী ছিলেন।
তিনি ছিলেন সদালাপী, অমায়িক ও সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। যতবারই তাঁর কাছে গিয়েছি, মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে কথা বলতে দেখেছি। তাঁর কথাবার্তায় ছিল আন্তরিকতা, আচরণে সৌজন্যবোধ আর মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা। তাঁর সঙ্গে কথা বললে কখনোই মনে হতো না, কোনো দূরত্বের দেয়াল পেরিয়ে কথা বলতে হচ্ছে।
একবার কোনো একটি নিউজের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে তিনি হয়তো সেদিন সাক্ষাৎকার দিতে আগ্রহী ছিলেন না। সরাসরি অপারগতার কথা না বলে অত্যন্ত কৌশলে, বিনয়ের সঙ্গে বিষয়টি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর কথার ধরন আর প্রকাশভঙ্গি থেকেই বুঝে নিয়েছিলাম, তিনি আপাতত নিজেকে প্রচারের আলোয় আনতে চাইছেন না। আমিও আর পীড়াপীড়ি করিনি। তাঁর অনিচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ফিরে এসেছিলাম।
পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, মানুষকে বিব্রত না করে নিজের অবস্থান বোঝানোর মধ্যেও একধরনের ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞার পরিচয় থাকে। তিনি সেই বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর মধ্যে যেমন ছিল স্পষ্টবোধ, তেমনি ছিল অন্যের অনুভূতি ও মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। কাউকে অস্বস্তিতে না ফেলে, সম্পর্কের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে নিজের কথা প্রকাশ করার এই সহজাত দক্ষতা তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে।
আজ স্মৃতির পাতা উল্টালে বুঝতে পারি, আবোলতাবোলকে ঘিরে তাঁর স্বপ্ন কেবল একটি শিশু সংগঠন গড়ে তোলা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, রাজবাড়ীর শিশুরা সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হোক, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর শ্রম, ভালোবাসা, কৌশল ও নিষ্ঠা তাঁকে আমাদের স্মৃতিতে স্বতন্ত্র করে রাখবে।
দেখেছি তাঁর জীবনসংগ্রামও। মারণব্যাধি ক্যান্সারকে জয় করে তিনি ঘরে বসে থাকেননি। বরং নিজের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্যান্সার সোসাইটি। ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। নিজের যন্ত্রণা থেকে অর্জিত উপলব্ধিকে তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন অন্যের কল্যাণে। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে।
কেন জানি মনে হয়, চাইলে তিনি আরও অনেক দূর যেতে পারতেন। তাঁর মধ্যে যে মেধা, প্রজ্ঞা ও সাহস দেখেছি, তা তাঁকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য রাখত। কিন্তু হয়তো রাজবাড়ীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, এই জনপদের মায়া তাঁকে এখানেই আটকে রেখেছিল। বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ থাকলেও তিনি রাজবাড়ীকে ঘিরেই তাঁর স্বপ্ন, সাধনা ও কর্মের জগৎ গড়ে তুলেছিলেন। হয়তো দূরে গেলে ব্যক্তিগতভাবে আরও বড় পরিসরে পরিচিত হতেন, কিন্তু রাজবাড়ীকে ভালোবেসে তিনি এই জনপদের মানুষের জন্য যে অবদান রেখে গেছেন, তার মূল্যও কম নয়। কিছু মানুষ নিজের গণ্ডি পেরিয়ে বড় হন, আর কিছু মানুষ যে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেই মাটিকেই সমৃদ্ধ করে তোলেন। তিনি ছিলেন সম্ভবত দ্বিতীয় দলের মানুষ—রাজবাড়ীর মায়ায় বাঁধা, রাজবাড়ীর মানুষের জন্য নিবেদিত এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনতার আদালত

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

স্মৃতির অর্ঘ্য

দেবাহুতি চক্রবর্তী: একজন মানুষ, বহুমাত্রিক সত্তা

প্রকাশের সময় : ০১:৪৫:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

তিনি নিজেকে সব সময় ্আড়ালেই রাখতে চাইতেন। অন্তত আমাদর সমাজ বাস্তবতায় প্রচারবিমুখ মানুষের সংখ্যা নেহায়েতই কম। তিনি তাদেরই একজন। আমরা সবাই তাকে সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে জানি। আইন পেশায় নিয়োজিত থাকায় নামের সঙ্গে ‘অ্যাডভোকেট’ উপাধিটি যুক্ত হয়েছে। এর বাইরেও তিনি নীরবে নিভৃতে কত কাজ করে গেছেন। ছিলেন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। কতবার দেখেছি, যে কথা বলার সাহস কেউ পেতেন না, সেই কথাই তিনি নির্ভয়ে, দ্বিধাহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। অন্যায়, অনিয়ম কিংবা অসংগতির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ কখনো থেমে থাকেনি। সত্যকে সত্য, আর অন্যায়কে অন্যায় বলার অসাধারণ সাহস ছিল তাঁর। পদ-পদবি, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা কারও বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে কখনো সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাঁর স্পষ্টবাদিতা কখনো কারও কাছে অপ্রিয় হয়েছে, আবার অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে সাহস ও প্রেরণার উৎস। এমন মানুষ কেবল নিজের অবস্থান থেকেই কথা বলেন না, কথা বলেন বিবেকের তাড়নায়, মানুষের পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে। তিনি অ্যাডভোকেট দেবাহুতি চক্রবর্তী।
সময়ের পরিক্রমায় তাঁর বলা কথাগুলোই বারবার মনে করিয়ে দেয়—সাহস করে সত্য উচ্চারণ করাও একধরনের দায়বদ্ধতা, একধরনের সংগ্রাম।
ক্ষুরধার লেখনী আর অসাধারণ শব্দচয়নের প্রতিভা ছিল তাঁর সহজাত। খুব বেশি লিখতেন না তিনি, কিন্তু যখনই লিখতেন, প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠত গভীর চিন্তা, প্রখর বিশ্লেষণ আর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর। তাঁর লেখার পরিমাণ নয়, গভীরতাই ছিল বড় পরিচয়। অল্প কথায় অনেক কিছু বলে দেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর প্রতিটি লেখা পাঠককে ভাবতে শেখাত, উপলব্ধির নতুন দরজা খুলে দিত। সত্যকে শাণিত শব্দে তুলে ধরার যে অসামান্য দক্ষতা তাঁর ছিল, তা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছিল। তিনি হয়তো নিয়মিত লিখতেন না, কিন্তু যখনই কলম ধরতেন, সৃষ্টি করতেন এমন কিছু, যার রেশ থেকে যেত পাঠকের মনে।
একটা উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে। রাজবাড়ী জেলা প্রেসক্লাবের স্মরণিকা ‘অক্ষর’ এর জন্য তাঁর কাছে লেখা চাইলাম। প্রথমে দিতেই চাইলেন না। আমি নাছোরবান্দা। লেখা নিয়েই ছাড়লাম। যে লেখাট তিনি দিলেন, তা ছিল অসাধারণ। দাদা ঠাকুর শরৎচন্দ্র পন্ডিত নামে যে এত বড় মাপের একজন সাংবাদিক ছিলেন তা আমার জানা ছিলনা। দাদা ঠাকুরকে নিয়ে লেখাটি ছিল অসাধারণ। ১৮৮১ সালে জন্ম নেওয়া দাদাঠাকুর ১৯৬৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের নানা বাঁক, সেই সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, সাংবাদিক হয়ে ওঠার পেছনের গল্প এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার সংগ্রাম—সবকিছুই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন লেখাটিতে। ইতিহাসের তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি একজন মানুষের জীবনসংগ্রামকে কীভাবে জীবন্ত করে তুলতে হয়, তা তাঁর লেখা না পড়লে হয়তো উপলব্ধিই করতে পারতাম না।
সেদিন আবারও উপলব্ধি করেছিলাম, কেন তাঁকে আমি ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী বলি। তিনি হয়তো নিয়মিত লিখতেন না, কিন্তু লিখতে বসলে বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করতেন। তাঁর লেখায় থাকত অনুসন্ধান, ইতিহাসবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর উপস্থাপনার অনন্য মুন্সিয়ানা। অল্প লেখার মধ্য দিয়েও যে অসাধারণত্বের স্বাক্ষর রাখা যায়, দাদাঠাকুরকে নিয়ে তাঁর সেই লেখাটি ছিল তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাজবাড়ীর শিশুরা যেন সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য, নাটক ও সৃজনশীলতার প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে—এই স্বপ্ন থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশু সংগঠন ‘আবোলতাবোল’। যত দিন সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন, তত দিন প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন সংগঠনটিকে সচল ও গতিশীল রাখতে। তাঁর আন্তরিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা আর নিরলস প্রচেষ্টায় আবোলতাবোল হয়ে উঠেছিল রাজবাড়ীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক পরিচিত নাম। সংগঠনটির নানা আয়োজন ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য। এসব আয়োজন সফল করে তুলতে তাঁর ছিল নিজস্ব কৌশল, বিচক্ষণতা এবং মানুষকে সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতা।
মনে পড়ে, আবোলতাবোল শিশু সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদের একটি নাটকের মহড়া চলছিল। মহড়ায় একজন অভিনয়শিল্পী বারবার ভুল করছিলেন। তাঁর নামটি এখন আর মনে নেই। টানা দুই-তিন দিন তিনি বিষয়টি লক্ষ করলেন। কিন্তু অভিনয়ে কোনো উন্নতি দেখা গেল না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো বিরক্ত হতেন, সরাসরি ধমক দিতেন কিংবা অপারগতার কথা বলে দিতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। কাউকে বিব্রত না করে, তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত না দিয়ে, অত্যন্ত কৌশলে বললেন, ‘তোমার চেষ্টাটা অসাধারণ। কিন্তু অন্য কেউ চরিত্রটা করলে নাটকের জন্য ভালো হবে।’
কথাটির মধ্যে ছিল একদিকে চেষ্টা ও আন্তরিকতার স্বীকৃতি, অন্যদিকে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার কোমল ইঙ্গিত। কাউকে ছোট না করে, তাঁর মন ভেঙে না দিয়ে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত কীভাবে জানাতে হয়, সেই প্রজ্ঞা তাঁর ছিল। সাংগঠনিক দক্ষতা কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা মানুষকে একত্র করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষকে বোঝা, তার অনুভূতির মর্যাদা দেওয়া এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেও তার পরিচয় মেলে। তিনি এসব গুণের অধিকারী ছিলেন।
তিনি ছিলেন সদালাপী, অমায়িক ও সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। যতবারই তাঁর কাছে গিয়েছি, মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে কথা বলতে দেখেছি। তাঁর কথাবার্তায় ছিল আন্তরিকতা, আচরণে সৌজন্যবোধ আর মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা। তাঁর সঙ্গে কথা বললে কখনোই মনে হতো না, কোনো দূরত্বের দেয়াল পেরিয়ে কথা বলতে হচ্ছে।
একবার কোনো একটি নিউজের জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে তিনি হয়তো সেদিন সাক্ষাৎকার দিতে আগ্রহী ছিলেন না। সরাসরি অপারগতার কথা না বলে অত্যন্ত কৌশলে, বিনয়ের সঙ্গে বিষয়টি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর কথার ধরন আর প্রকাশভঙ্গি থেকেই বুঝে নিয়েছিলাম, তিনি আপাতত নিজেকে প্রচারের আলোয় আনতে চাইছেন না। আমিও আর পীড়াপীড়ি করিনি। তাঁর অনিচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ফিরে এসেছিলাম।
পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, মানুষকে বিব্রত না করে নিজের অবস্থান বোঝানোর মধ্যেও একধরনের ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞার পরিচয় থাকে। তিনি সেই বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর মধ্যে যেমন ছিল স্পষ্টবোধ, তেমনি ছিল অন্যের অনুভূতি ও মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। কাউকে অস্বস্তিতে না ফেলে, সম্পর্কের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে নিজের কথা প্রকাশ করার এই সহজাত দক্ষতা তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে।
আজ স্মৃতির পাতা উল্টালে বুঝতে পারি, আবোলতাবোলকে ঘিরে তাঁর স্বপ্ন কেবল একটি শিশু সংগঠন গড়ে তোলা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন, রাজবাড়ীর শিশুরা সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হোক, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর শ্রম, ভালোবাসা, কৌশল ও নিষ্ঠা তাঁকে আমাদের স্মৃতিতে স্বতন্ত্র করে রাখবে।
দেখেছি তাঁর জীবনসংগ্রামও। মারণব্যাধি ক্যান্সারকে জয় করে তিনি ঘরে বসে থাকেননি। বরং নিজের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্যান্সার সোসাইটি। ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। নিজের যন্ত্রণা থেকে অর্জিত উপলব্ধিকে তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন অন্যের কল্যাণে। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে।
কেন জানি মনে হয়, চাইলে তিনি আরও অনেক দূর যেতে পারতেন। তাঁর মধ্যে যে মেধা, প্রজ্ঞা ও সাহস দেখেছি, তা তাঁকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য রাখত। কিন্তু হয়তো রাজবাড়ীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, এই জনপদের মায়া তাঁকে এখানেই আটকে রেখেছিল। বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ থাকলেও তিনি রাজবাড়ীকে ঘিরেই তাঁর স্বপ্ন, সাধনা ও কর্মের জগৎ গড়ে তুলেছিলেন। হয়তো দূরে গেলে ব্যক্তিগতভাবে আরও বড় পরিসরে পরিচিত হতেন, কিন্তু রাজবাড়ীকে ভালোবেসে তিনি এই জনপদের মানুষের জন্য যে অবদান রেখে গেছেন, তার মূল্যও কম নয়। কিছু মানুষ নিজের গণ্ডি পেরিয়ে বড় হন, আর কিছু মানুষ যে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেই মাটিকেই সমৃদ্ধ করে তোলেন। তিনি ছিলেন সম্ভবত দ্বিতীয় দলের মানুষ—রাজবাড়ীর মায়ায় বাঁধা, রাজবাড়ীর মানুষের জন্য নিবেদিত এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনতার আদালত