বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে ৬ প্রশ্ন, মিলছে না উত্তর

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ০৪:৪০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 15

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ রাজধানীর উপকণ্ঠে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, বাসা থেকে ডেকে নেওয়া ব্যক্তি এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে রহস্যের কথা জানিয়েছেন তাঁর বাবা। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তাঁর ছেলের এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচ থেকে ডাক দিলে মাকে জানিয়ে বেরিয়ে যান তাহসিফ। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে বার্তা পাঠিয়ে তিনি জানান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে হেলাল জানান, ঘটনার দিন তাহসিফ প্রায় সারা দিন মায়ের সঙ্গে ছিলেন। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপের ডাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর ফেরেননি।

ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলেও জানান হেলাল। তাঁর দাবি, তখন পুলিশ তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে নদীতে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।

মরদেহ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে তাহসিফের বাবা বলেন, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন ওই এলাকায় তাঁর ছেলে কখনো যাননি। ফলে সেখানে কীভাবে তিনি পৌঁছালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে পরিবারের। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ। তবে তাহসিফ ভিডিওটি ধারণ বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে প্রকাশিত ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের বিষয়টি তোলেন। কিছু ঘটনা প্রকাশ করতে পারবেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’

তাহসিফের বাবা জানান, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতির কারণ হিসেবে পরিবারকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কথা জানানো হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর চাকরি ছাড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি।

ছেলে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে হেলাল বলেন, তাহসিফ হুমকির বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে তিনি কিছুটা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন।

এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ভিডিও ফাঁসের ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা; এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।

তাহসিফের শেষ বার্তা, বাসা থেকে বের হওয়ার পরের সময়টুকু, রাজাবাড়ী ঘাটে পৌঁছানোর পরিস্থিতি এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে এসব প্রশ্নের সমাধান।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে ৬ প্রশ্ন, মিলছে না উত্তর

প্রকাশের সময় : ০৪:৪০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ রাজধানীর উপকণ্ঠে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, বাসা থেকে ডেকে নেওয়া ব্যক্তি এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে রহস্যের কথা জানিয়েছেন তাঁর বাবা। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তাঁর ছেলের এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচ থেকে ডাক দিলে মাকে জানিয়ে বেরিয়ে যান তাহসিফ। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে বার্তা পাঠিয়ে তিনি জানান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে হেলাল জানান, ঘটনার দিন তাহসিফ প্রায় সারা দিন মায়ের সঙ্গে ছিলেন। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপের ডাকে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর ফেরেননি।

ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলেও জানান হেলাল। তাঁর দাবি, তখন পুলিশ তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে নদীতে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।

মরদেহ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে তাহসিফের বাবা বলেন, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন ওই এলাকায় তাঁর ছেলে কখনো যাননি। ফলে সেখানে কীভাবে তিনি পৌঁছালেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে পরিবারের। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ। তবে তাহসিফ ভিডিওটি ধারণ বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে প্রকাশিত ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের বিষয়টি তোলেন। কিছু ঘটনা প্রকাশ করতে পারবেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’

তাহসিফের বাবা জানান, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতির কারণ হিসেবে পরিবারকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কথা জানানো হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর চাকরি ছাড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি।

ছেলে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে হেলাল বলেন, তাহসিফ হুমকির বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে তিনি কিছুটা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন।

এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ভিডিও ফাঁসের ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা; এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।

তাহসিফের শেষ বার্তা, বাসা থেকে বের হওয়ার পরের সময়টুকু, রাজাবাড়ী ঘাটে পৌঁছানোর পরিস্থিতি এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে এসব প্রশ্নের সমাধান।