জুলাই সনদে বিএনপির ভিন্নমত নিয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত

- প্রকাশের সময় : ০৮:৩০:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / 13

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার। তবে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে ভিন্নমতের বিষয়গুলোতেও সমঝোতার পথ খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরকার ও সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী দলগুলো আলোচনায় অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব, আপত্তি ও ভিন্নমত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে জুলাই জাতীয় সনদে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কোনো বিষয় পরিবর্তন, পরিমার্জন বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য মোট ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এবং বাকি ৩৭টি বিদ্যমান আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সনদের মূল চেতনার সঙ্গে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছিল।
বিএনপির ভিন্নমতের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের ক্ষমতা ও গঠনপ্রণালি, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কিছু দিক এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের ভূমিকা।
২০২৬ সালের আগস্টে জাতীয় সংসদে প্রথমে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটিটি ১৭ সদস্যে পুনর্গঠন করা হয়। এরপর রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, সাংবাদিক, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করে কমিটি।
গত ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ কমিটির বৈঠক হয়। ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ১৫টি দল সরাসরি অংশ নেয় এবং একটি দল লিখিত প্রস্তাব দেয়। বৈঠকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের পূর্ণাঙ্গ খসড়া তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরোধী দলগুলোর একাংশের আলোচনা বর্জন। জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী জোটের কয়েকটি দল বিশেষ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়নি। সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অন্যদিকে, কমিটির গঠনকাঠামো ও আইনি পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলে আলোচনার বাইরে রয়েছে বর্জনকারী দলগুলো।
দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে বিশেষ কমিটি। সেখানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেন। বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংশোধনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
বৈঠকে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার সংঘাত, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের মতো বিষয়েও পর্যালোচনার দাবি ওঠে।
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলসহ সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। জুলাই সনদে কোনো দল ভিন্নমত জানিয়ে থাকলে সেই অবস্থানে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মনে করেন, জুলাই জাতীয় সনদের চেতনা বাস্তবায়নে সংবিধানের ব্যাপক সংশোধন প্রয়োজন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও জানিয়েছেন, সনদে স্বাক্ষর করা বিষয়গুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।
অন্যদিকে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, দলটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থেকে একচুলও সরে আসেনি। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানে অনড় রয়েছে। সনদের যেসব বিষয়ে দলটি ভিন্নমত জানিয়েছে, সেগুলো নির্বাচনী ইশতেহারেও তুলে ধরে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিফলিত হয়ে থাকলে সংবিধান সংশোধনের সময় বৃহত্তর স্বার্থে সেই ইশতেহারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এতে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান পরিবর্তন না করলেও সমঝোতার সুযোগ খোলা রাখার ইঙ্গিত রয়েছে।
অধ্যাপক গোলাম হাফিজ বলেন, রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায়। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রত্যাহার না করলেও সরকার বিরোধীদের আলোচনায় এনে ভিন্নমতের বিষয়গুলোতে সমঝোতার পথ খোলা রাখতে চাইছে।
তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে কতটা সমঝোতা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সংশোধনের চূড়ান্ত রূপরেখা। ফলে বিষয়টি শুধু একটি বিল পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক সহনশীলতার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সূত্র: বাংলানিউজ






















