Dhaka ১০:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপালে আকস্মিক বন্যা : পাহাড়ের বনে সারি সারি গণকবর

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • / 3

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের পাহাড়ি বনাঞ্চলে অস্থায়ী গণকবর তৈরি করা হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন, অন্যদিকে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর পানিতে ভেসে আসা এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ চিতওয়ানের দেবঘাট বনাঞ্চলে দাফন করা হচ্ছে। দুর্যোগকবলিত রসুয়া অঞ্চলের উপত্যকাগুলো থেকে এলাকাটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে।

কয়েক দিন আগেও দেবঘাটের বনপথ ছিল স্থানীয়দের হাঁটার জনপ্রিয় স্থান। কিন্তু বন্যার পর সেই বনাঞ্চলই পরিণত হয়েছে পরিচয়হীন মরদেহের অস্থায়ী কবরস্থানে। অতিরিক্ত সময় পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহ এমনভাবে পচে গেছে যে সেগুলোর চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিতওয়ানের ভারতপুরের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আর্যাল জানান, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহগুলো দ্রুত দাফন করা হচ্ছে।

শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

মরদেহ শনাক্তের কাজে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। তারা মরদেহের তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করছেন, ছবি তুলছেন এবং স্বজনদের শনাক্তকরণে সহযোগিতা করছেন। প্রতিটি মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কবরের ওপর ও মাটির নিচে শনাক্তকরণ চিহ্ন রাখার পাশাপাশি কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও নথিভুক্ত করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে তা খুঁজে বের করা যায়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিচয়হীন মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। সরকারি নথি বা জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে প্রয়োজনে দেহাবশেষ উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।

মরদেহ শনাক্তে নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন। ভারত ইতিমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে। দলটি নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে নেপাল।

এদিকে চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালেও মরদেহ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতালের অস্থায়ী মর্গে প্রায় ১২৫টি মরদেহ রাখা হয়েছে, যদিও এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০টি। কয়েক দিন বন্যার পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহই পচে গেছে।

মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক অনিল থাপা জানান, উদ্ধার হওয়া অর্ধেকের বেশি মরদেহ শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখও চেনার উপায় নেই।

হাসপাতালের বাইরে থেকেই পচা মরদেহের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ ও হাসপাতালের কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে। মরদেহ শনাক্তের আশায় ভারতপুরের একটি কেন্দ্রে ভিড় করছেন নিখোঁজদের স্বজনরাও। দুই শতাধিক মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছেন বলে জানা গেছে।

স্বজনদের অনেকে দূরবর্তী এলাকা থেকে ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে সেখানে এসেছেন। কারও কারও অভিযোগ, আগের দিন পৌঁছালেও এখনো মরদেহ শনাক্তের জন্য ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাননি।

মরদেহ সংরক্ষণে আরেকটি পুরোনো একতলা ভবনকেও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক ও পুলিশের নিবন্ধনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মরদেহ পচন ধীর করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রাই আইস, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও কুলিং ইউনিট।

এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একসঙ্গে ১৩টি মরদেহ একটি গাড়িতে করে অস্থায়ী মর্গে আনা হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে সেখানে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সও অবস্থান করছিল।

নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জন আছেন কি না—এই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তারা।

গত বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

নেপালে আকস্মিক বন্যা : পাহাড়ের বনে সারি সারি গণকবর

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের পাহাড়ি বনাঞ্চলে অস্থায়ী গণকবর তৈরি করা হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন, অন্যদিকে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর পানিতে ভেসে আসা এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ চিতওয়ানের দেবঘাট বনাঞ্চলে দাফন করা হচ্ছে। দুর্যোগকবলিত রসুয়া অঞ্চলের উপত্যকাগুলো থেকে এলাকাটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে।

কয়েক দিন আগেও দেবঘাটের বনপথ ছিল স্থানীয়দের হাঁটার জনপ্রিয় স্থান। কিন্তু বন্যার পর সেই বনাঞ্চলই পরিণত হয়েছে পরিচয়হীন মরদেহের অস্থায়ী কবরস্থানে। অতিরিক্ত সময় পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহ এমনভাবে পচে গেছে যে সেগুলোর চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিতওয়ানের ভারতপুরের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আর্যাল জানান, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়া মরদেহগুলো দ্রুত দাফন করা হচ্ছে।

শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

মরদেহ শনাক্তের কাজে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। তারা মরদেহের তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করছেন, ছবি তুলছেন এবং স্বজনদের শনাক্তকরণে সহযোগিতা করছেন। প্রতিটি মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কবরের ওপর ও মাটির নিচে শনাক্তকরণ চিহ্ন রাখার পাশাপাশি কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও নথিভুক্ত করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে তা খুঁজে বের করা যায়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিচয়হীন মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। সরকারি নথি বা জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে প্রয়োজনে দেহাবশেষ উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।

মরদেহ শনাক্তে নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞরাও কাজ করছেন। ভারত ইতিমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে। দলটি নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে নেপাল।

এদিকে চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালেও মরদেহ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতালের অস্থায়ী মর্গে প্রায় ১২৫টি মরদেহ রাখা হয়েছে, যদিও এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০টি। কয়েক দিন বন্যার পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহই পচে গেছে।

মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক অনিল থাপা জানান, উদ্ধার হওয়া অর্ধেকের বেশি মরদেহ শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখও চেনার উপায় নেই।

হাসপাতালের বাইরে থেকেই পচা মরদেহের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ ও হাসপাতালের কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে। মরদেহ শনাক্তের আশায় ভারতপুরের একটি কেন্দ্রে ভিড় করছেন নিখোঁজদের স্বজনরাও। দুই শতাধিক মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছেন বলে জানা গেছে।

স্বজনদের অনেকে দূরবর্তী এলাকা থেকে ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে সেখানে এসেছেন। কারও কারও অভিযোগ, আগের দিন পৌঁছালেও এখনো মরদেহ শনাক্তের জন্য ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাননি।

মরদেহ সংরক্ষণে আরেকটি পুরোনো একতলা ভবনকেও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক ও পুলিশের নিবন্ধনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। মরদেহ পচন ধীর করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রাই আইস, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও কুলিং ইউনিট।

এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একসঙ্গে ১৩টি মরদেহ একটি গাড়িতে করে অস্থায়ী মর্গে আনা হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে সেখানে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সও অবস্থান করছিল।

নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জন আছেন কি না—এই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তারা।

গত বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স