৬ বছর ধরে ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি করিয়ে ছেলের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন মুন্নু শেখ
- প্রকাশের সময় : ০১:১৩:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
- / 29
রাজবাড়ীর কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে প্রতিদিন দুপুরে দেখা মেলে এক ব্যতিক্রমী মানবিক দৃশ্যের। ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই হাতে বালতি আর ঠান্ডা পানিভর্তি বোতল নিয়ে প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছুটে বেড়ান এক মধ্যবয়সী মানুষ। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন, নেই কোনো প্রচারণা বা স্বার্থের হিসাব। শুধুমাত্র মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তুলে দেন এক বোতল করে পানি। এই মানুষটির নাম মুন্নু শেখ। তিনি মুন্নু শেখ রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের মোবারক শেখের ছেলে৷
টানা ছয় বছর ধরে তিনি কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে আসছেন। বর্তমান সময়ে, যখন অনেকেই স্বার্থ ছাড়া এক পা এগোতে চান না, তখন মুন্নু শেখের এই নিঃস্বার্থ মানবসেবা স্থানীয়দের পাশাপাশি যাত্রীদেরও মুগ্ধ করেছে। তবে এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে লুকিয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক গল্প।
২০১৮ সালে মুন্নু শেখের নয় বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। ছেলের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াত করতে হতো তাদের। সেই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল ট্রেন। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যখন অসুস্থ ছেলের জন্য একটি বোতল পানি কেনার মতো টাকাও তার কাছে থাকত না।
দীর্ঘ দুই বছরের লড়াই শেষে ২০২০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ছোট্ট সবুজ। সন্তানের মৃত্যু মুন্নু শেখকে ভেঙে দিলেও থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন—যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানির কষ্ট পেতে দেবেন না। সেই প্রতিজ্ঞায় তিনি আজও অটুট।
প্রতিদিন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন কালুখালী স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই নিজের চটপটির দোকান বন্ধ করে পানির বোতল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ব্যবহৃত বোতলগুলো ভালোভাবে ধুয়ে টিউবওয়েলের পানি ভরে রাখেন। ট্রেন স্টেশনে থামা মাত্রই এক বগি থেকে আরেক বগিতে ছুটে গিয়ে তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে বিনামূল্যে পানির বোতল তুলে দেন।
প্রায় ২০ বছর ধরে কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি ছোট্ট চটপটির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মুন্নু শেখ। যাত্রীদের পানি পান করাতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা দোকান বন্ধ রাখতে হয় তাকে। এতে আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতি হলেও এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। মানুষের মুখে হাসি আর তাদের আন্তরিক দোয়া-ভালোবাসাকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন।
মুন্নু শেখ বলেন, “যখন ছোট কোনো শিশুর হাতে পানি তুলে দিই, তখন আমার ছেলে সবুজের মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয়, যেন ওকেই পানি খাওয়াচ্ছি। যতদিন বাঁচব, এভাবেই মানুষের হাতে পানি তুলে দিয়ে যাব।”
তিনি আরও বলেন, “চটপটি বিক্রির পাশাপাশি যাত্রীদের পানি খাওয়ানোর জন্য বোতল সংগ্রহ করি। ট্রেন আসার আগে বোতলগুলো ভালোভাবে ধুয়ে টিউবওয়েলের পানি ভরে রাখি। এরপর ট্রেন আসা মাত্রই যাত্রীদের কাছে ছুটে যাই।”
ট্রেনের যাত্রী সুমন মোল্লা বলেন, “ট্রেনে এমন মানবিক উদ্যোগ সত্যিই বিরল। উনার দেওয়া পানি পান করে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। এমন মানুষ সমাজে আরও থাকা উচিত।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, কালুখালী স্টেশনে এখন মুন্নু শেখ একটি পরিচিত মুখ। প্রতিদিনের এই মানবিক উদ্যোগ অনেক যাত্রীর কাছে আশীর্বাদের মতো। তারা মনে করেন, একজন সাধারণ চটপটি বিক্রেতা হয়েও মুন্নু শেখ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানবতার এই আলোকবর্তিকা সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হোন। ছেলের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে তিনি যেন যুগের পর যুগ এভাবেই তৃষ্ণার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।




















