বিশ্বকাপ ঘিরে জুয়ার রমরমা, শঙ্কায় পরিবার ও সমাজ
- প্রকাশের সময় : ০৯:৫৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
- / 20
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার চক্র। খেলার উন্মাদনাকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসিক এলাকাতেও বসছে জুয়ার আসর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুয়ার এই বিস্তার শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে হাজারো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সিআইডির সাইবার সেন্টারের কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনটিতে নির্ধারিত শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অপরাধ দমনে কার্যকর প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ বা বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরকে কেন্দ্র করে জুয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকেই প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে ছোট অঙ্কের বাজি দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বড় টুর্নামেন্ট চলাকালে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক তরুণ ও শিক্ষার্থী জুয়ার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বারবার বাজি ধরার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত তাদের আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে জুয়ার প্রচারণার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং প্ল্যাটফর্ম এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তিত্ব বা জনপ্রিয় মুখের আদলে ভার্চুয়াল চরিত্র তৈরি করে প্রচারণা চালাচ্ছে। এসব প্রচারণা অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করছে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার ও প্রযুক্তিবিদ ইকরামুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অর্থ বিদেশি বেটিং সাইটে স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জুয়াকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মহত্যা, হত্যাকাণ্ড, ঋণগ্রস্ততা এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জুয়া শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন. এম. নাসিরুদ্দিন বলেন, অনলাইনভিত্তিক অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে জুয়ার বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।



















