Dhaka ০৩:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জমি নিয়ে বিরোধে নিহতের জেরে প্রতিপক্ষের ৮টি বাড়িঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ০৭:২২:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 63

রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া খোন্দকারপাড়ায় জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলা, সংঘর্ষ ও একজন নিহতের জের ধরে মঙ্গলবার সকালে প্রতিপক্ষের আটটি বসতঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখনও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার সকালে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আতর আলীর পরিবারের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। হামলাকারীরা প্রথমে নতুন নির্মিত একটি ঘর ভাঙচুর করে আগুন দেয়। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এতে আতর আলীর পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ও পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সন্ধ্যায় আতর আলীর (৪২) মৃত্যু হয়। নিহত আতর আলী একই গ্রামের আইনুদ্দিন শেখের ছেলে।  তার মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে প্রতিপক্ষের আফাজ উদ্দিন সরদার, নিফাজ সরদার ও কামিন সরদারের বসতঘর, গোয়ালঘর ও রান্নাঘরসহ মোট আটটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পুড়ে যায়। এছাড়া সিদ্দিক সরদার ও সাইদুর সরদারের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। খবর পেয়ে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে তার আগেই অধিকাংশ ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। টিনের তৈরি বসতঘর, গোয়াল ঘর ও রান্নাঘর ভস্মীভূত হয়ে যায়।

মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের উত্তর পাশে নিহত আতর আলী ও তার ভাইদের বসতভিটা এবং দক্ষিণ পাশে আফাজ উদ্দিন সরদর নিফাজ সরদার পরিবারের বাড়িগুলো অবস্থিত। মাঝখানে একটি পুকুর রয়েছে।  আর পূর্ব দিকে মুল অভিযুক্ত সৈয়দ শামসুল হক সুর্যের বাড়ি। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছিল। ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

নিফাজ ও আফাজ সরদারের বাবা মফিজ উদ্দিন বলেন, সকালে বাড়িতে কেউ ছিল না। আমি বৃদ্ধ মানুষ, সকালে কারা এসে আমার ছেলেদের ঘরে আগুন দিয়েছে চিনতে পারিনি। আমার ছেলেরা সূর্যের কাছ থেকে জমি গিরফি(বন্ধক) নিয়ে চাষ করে। সেই জমি নিয়েই বিরোধ চলছে।

অন্যদিকে নিহত আতর আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী। তাদের একমাত্র ছেলের বয়স প্রায় ১০ বছর এবং আরও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।

আতর আলীর চাচাতো বোন রিয়া খাতুন দাবি করেন, জমিটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আদালতের মাধ্যমে আমরা জমির অধিকার পেয়েছি। কিন্তু প্রতিপক্ষ জোর করে দখলে রেখেছে। পরিকল্পিতভাবে হামলা করে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। মামলা দুর্বল করার জন্য তারাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়েছে।

মূল অভিযুক্ত সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

রাজবাড়ী ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, আগুনে আটটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

রাজবাড়ী সদর থানার ওসি খন্দকার জিয়াউর রহমান বলেন, নিহত আতর আলীর বড় ভাই রজব আলী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কারা অগ্নিসংযোগ করেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১৮ একর জমি নিয়ে একই গ্রামের সৈয়দ জাবেদ আলীর পরিবার এবং মৃত জলিল শেখের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। স্বাধীনতার পর সৈয়দ জাবেদ আলী ওই জমিতে বসতি স্থাপন করেন। পরে জলিল শেখের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা পৈতৃক সম্পত্তির দাবি করে দুই মাস আগে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণ করলে নতুন করে বিরোধ শুরু হয়। বিষয়টি আদালত ও থানায় গড়ায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

জমি নিয়ে বিরোধে নিহতের জেরে প্রতিপক্ষের ৮টি বাড়িঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ

প্রকাশের সময় : ০৭:২২:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া খোন্দকারপাড়ায় জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলা, সংঘর্ষ ও একজন নিহতের জের ধরে মঙ্গলবার সকালে প্রতিপক্ষের আটটি বসতঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখনও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার সকালে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আতর আলীর পরিবারের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। হামলাকারীরা প্রথমে নতুন নির্মিত একটি ঘর ভাঙচুর করে আগুন দেয়। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। এতে আতর আলীর পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ও পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সন্ধ্যায় আতর আলীর (৪২) মৃত্যু হয়। নিহত আতর আলী একই গ্রামের আইনুদ্দিন শেখের ছেলে।  তার মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে প্রতিপক্ষের আফাজ উদ্দিন সরদার, নিফাজ সরদার ও কামিন সরদারের বসতঘর, গোয়ালঘর ও রান্নাঘরসহ মোট আটটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পুড়ে যায়। এছাড়া সিদ্দিক সরদার ও সাইদুর সরদারের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। খবর পেয়ে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে তার আগেই অধিকাংশ ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। টিনের তৈরি বসতঘর, গোয়াল ঘর ও রান্নাঘর ভস্মীভূত হয়ে যায়।

মঙ্গলবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের উত্তর পাশে নিহত আতর আলী ও তার ভাইদের বসতভিটা এবং দক্ষিণ পাশে আফাজ উদ্দিন সরদর নিফাজ সরদার পরিবারের বাড়িগুলো অবস্থিত। মাঝখানে একটি পুকুর রয়েছে।  আর পূর্ব দিকে মুল অভিযুক্ত সৈয়দ শামসুল হক সুর্যের বাড়ি। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছিল। ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

নিফাজ ও আফাজ সরদারের বাবা মফিজ উদ্দিন বলেন, সকালে বাড়িতে কেউ ছিল না। আমি বৃদ্ধ মানুষ, সকালে কারা এসে আমার ছেলেদের ঘরে আগুন দিয়েছে চিনতে পারিনি। আমার ছেলেরা সূর্যের কাছ থেকে জমি গিরফি(বন্ধক) নিয়ে চাষ করে। সেই জমি নিয়েই বিরোধ চলছে।

অন্যদিকে নিহত আতর আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী। তাদের একমাত্র ছেলের বয়স প্রায় ১০ বছর এবং আরও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।

আতর আলীর চাচাতো বোন রিয়া খাতুন দাবি করেন, জমিটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আদালতের মাধ্যমে আমরা জমির অধিকার পেয়েছি। কিন্তু প্রতিপক্ষ জোর করে দখলে রেখেছে। পরিকল্পিতভাবে হামলা করে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। মামলা দুর্বল করার জন্য তারাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়েছে।

মূল অভিযুক্ত সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

রাজবাড়ী ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, আগুনে আটটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

রাজবাড়ী সদর থানার ওসি খন্দকার জিয়াউর রহমান বলেন, নিহত আতর আলীর বড় ভাই রজব আলী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কারা অগ্নিসংযোগ করেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১৮ একর জমি নিয়ে একই গ্রামের সৈয়দ জাবেদ আলীর পরিবার এবং মৃত জলিল শেখের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। স্বাধীনতার পর সৈয়দ জাবেদ আলী ওই জমিতে বসতি স্থাপন করেন। পরে জলিল শেখের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা পৈতৃক সম্পত্তির দাবি করে দুই মাস আগে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণ করলে নতুন করে বিরোধ শুরু হয়। বিষয়টি আদালত ও থানায় গড়ায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।