বালিয়াকান্দির সোনাপুরে গফুরের কুটির শিল্পে মোঘল আমলের কারুকার্য
- প্রকাশের সময় : ১২:২৭:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 105
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের সোনাপুর বাজারে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে এক ভিন্নধর্মী কুটির শিল্পাঙ্গন। মোঘল আমলের স্থাপত্য ও কারুকার্যের ছোঁয়ায় সাজানো এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। এর নেপথ্যের মানুষটি হলেন আব্দুল গফুর মণ্ডল—যিনি দারিদ্রতাকে জয় করে আজ নিজেই হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের পথপ্রদর্শক।
দারিদ্রতার কষাঘাতে আব্দুল গফুরের শৈশব ছিল সংগ্রামের। লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে খুব অল্প বয়সেই তাকে স্কুল ছাড়তে হয়। গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমান জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু ভাগ্যের কাছে হার মানেননি তিনি। মনের গভীরে লালিত স্বপ্ন আর নিজের হাতে কাজ শেখার প্রবল আগ্রহ তাকে টেনে আনে কুটির শিল্পের জগতে।
চুনাপাথরের সাধারণ কারুকার্য নয়—আব্দুল গফুরের তৈরি নকশাগুলো যেন মোঘল আমলের নির্মিত বহুতল ভবনের অলঙ্করণ। ইতিহাস থেকে জানাযায় মোগল সাম্রাজ্য (১৫২০-এর দশক থেকে ১৮৫৭) দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশাল অংশ শাসন করত, যা বাবর কর্তৃক পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীর পরাজয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধর মুঘলরা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চল জুড়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে, যা আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের মতো সম্রাটদের অধীনে সমৃদ্ধ হয় এবং তাজমহল, লালকেল্লার মতো স্থাপত্য ও শিল্পকলার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
ঐতিহ্যবাহী মোঘল স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তিনি প্লাস্টার কারুকার্যে এনে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। তার শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে বিভিন্ন প্রকারের ফুলের নকশা, বেলকনি প্লার, জানালার হাফ প্লার, নৈছা প্লার, রেলিং প্লারসহ নানান নান্দনিক ডিজাইন।
শহরে কাজ শেখার পর আবার নিজের জন্মভূমিতে ফিরে এসে তিনি গড়ে তোলেন শিল্প প্রতিষ্ঠান“মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজ”। এখানে সুলভ মূল্যে মোঘল আমলের কারুকার্য খচিত বিভিন্ন ধরনের প্লার ও ডিজাইন সামগ্রী তৈরি ও বিক্রি করা হয়। শুধু নিজে স্বাবলম্বী হওয়াই নয়, এই প্রতিষ্ঠানটি এলাকার বেকার যুবকদের জন্য তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
শৈশবে আব্দুল গফুরের স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শিখে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। দারিদ্রতা সে স্বপ্ন ভেঙে দিলেও আজ তার হাতের শিল্পই হয়ে উঠেছে সাফল্যের সিঁড়ি। নিজের পরিশ্রম, ধৈর্য ও সৃজনশীলতায় তিনি প্রমাণ করেছেন—চাইলেই প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।
আব্দুল গফুরের এই উদ্যোগ আজ এলাকার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে চমক ও অনুপ্রেরণা। তার মতো যদি বেকার যুবকেরা নিজ নিজ উদ্যোগে শিল্পকর্ম বা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসে, তবে সমাজ থেকে অনেকাংশেই বেকারত্ব দূর করা সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।
মোঘল আমলের কারুকার্যে গড়ে ওঠা এই কুটির শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি এক সংগ্রামী জীবনের সফল পরিণতির গল্প।


























