Dhaka ০৬:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি শিক্ষার উন্নয়নে তিন অস্ত্র : সর্বজনীন বদলি, যোগ্য নেতৃত্ব ও একীভূতকরণ

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৯:২৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / 124

শিক্ষা জাতির মৌলিক ভিত্তি—আর সেই ভিত্তিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, জবাবদিহি এবং গুণগত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগীদের দাবির প্রতিফলন হিসেবে সর্বজনীন বদলি প্রথা এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। একই সাথে সরকার অচিরেই অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করতে যাচ্ছে।

এই দুটি যুগান্তকারী নীতি শিক্ষার মানোন্নয়ন, সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষক ব্যবস্থাপনায় ন্যায় ও দক্ষতা নিশ্চিত করবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতএব, বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে একটি বাস্তবসম্মত অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে।

বদলি ব্যবস্থা: স্থবিরতা ভেঙে উন্নয়নের পথে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ না থাকায় বহু শিক্ষক বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। এতে—

* পেশাগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়

* একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় ও কর্মউদ্দীপনা কমে যায়

* জনবল বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়

* ছাত্রবিহীন জায়গায় শিক্ষক থাকা এবং ছাত্রসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট তৈরি হয়

* সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে

* স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে

এই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর করতে সর্বজনীন বদলি নীতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সর্বজনীন বদলি ব্যবস্থা চালু হলে—

* ছাত্রসংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষক বণ্টন সম্ভব হবে

* নন-পারফর্মিং প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস সম্ভব হবে

* কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে

* পেশাগত বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতার উন্নয়ন ঘটবে

* সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হবে

* শিক্ষকরা স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে না

ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন গতি আসবে এবং শিক্ষকতার মর্যাদা ও উৎসাহ বাড়বে।

অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ: নীতিগত সাহসী পদক্ষেপ

দেশে বর্তমানে ২৮ হাজারেরও বেশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী নেই; আবার কোথাও শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক নেই। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করতেই সরকার একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করছে।

মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই অসঙ্গতি দূর করতে সরকার অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহ :

* মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ

* শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষক সংখ্যা ও কার্যক্রম যাচাই

* তালিকা প্রণয়ন

* নিকটবর্তী কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূতকরণ

সম্ভাব্য সুফল:

* শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে

* শিক্ষক সংকট নিরসন হবে

* অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার হবে

* ভুয়া এমপিও ও অপচয় রোধ হবে

* সরকারি ব্যয় সাশ্রয় হবে

* সাশ্রয়কৃত অর্থ শিক্ষার উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে

* শিক্ষকরা স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে না

যদিও এতে কিছু প্রশাসনিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে, তবুও সুশাসন ও নীতির দৃঢ় প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠান প্রধানের দক্ষতা: সুশাসনের চালিকাশক্তি

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তার নেতৃত্ব—বিশেষ করে অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক। তাই প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও নেতৃত্ব গুণই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে নেতৃত্বের মান নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে—এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।

প্রস্তাবনা:

* একাডেমিক যোগ্যতা, সার্ভিস রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা নিয়ন্ত্রণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কাজের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন

* নেতৃত্বগুণ, সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা

* বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কার্যকর দক্ষতা

* পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ

* গবেষণাকর্ম ও নিবন্ধ প্রকাশনা অগ্রাধিকার

* সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অগ্রগতিমূলক কাজে সক্রিয়তা

এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার পরিবেশ হবে আরও মানসম্মত।

প্রমোশন বৈষম্য: রেশিও সংস্কার ও উচ্চ পদ সৃষ্টি জরুরি

বর্তমান অমানবিক ও অযৌক্তিক বিষয়ভিত্তিক রেশিও প্রথা চালু থাকায় বহু মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা  পদোন্নতি বৈষম্যের বেশি  শিকার হচ্ছেন।

জনবল কাঠামো অনুযায়ী  ডিগ্রী অধিভুক্ত কলেজে আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজিতে দুজন করে শিক্ষক পায় এবং অন্যান্য ঐচ্ছিক বিষয়েও দু’জন করে (ডিগ্রিতে বিষয় অনুমোদন সাপেক্ষে)। ডিগ্রিতে বিষয় অনুমোদন না থাকলে একজন। ফলে অধিকাংশ ডিগ্রি অধিভুক্ত কলেজে বিষয়ভিত্তিক একজন সহকারী অধ্যাপক পদ থাকায় বাংলা ও ইংরেজিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং  বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এ সমস্যা আরও জটিল হয় যখন দেখি, বেসরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদই সৃষ্টি করা হয়নি, যার ফলে শিক্ষকদের ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত লক্ষ্যই অনুপস্থিত। এর ফলে হতাশা বাড়ছে ও কর্মউদ্দীপনা কমছে, যা শিক্ষার গুণগত পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমাধান প্রস্তাব:

* নির্দিষ্ট চাকরিকাল শেষেই সবার প্রমোশন নিশ্চিত করা

* একাডেমিক রেজাল্ট, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া

* বেসরকারি কলেজগুলোতে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করা

* বৈষম্য দূর করে উদ্দীপনামূলক পদোন্নতি কাঠামো দ্রুত তৈরি ও বাস্তবায়ন করা

এতে শিক্ষক সমাজে উৎসাহ ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং পেশাটিতে প্রতিভাবান তরুণদের আগ্রহও বাড়বে।

মূল সুপারিশসমূহ :

* সর্বজনীন বদলি ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন

* অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা

* অধ্যক্ষ নিয়োগে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক মানদণ্ড

* অধিকতর যোগ্য প্রার্থী পেতে  মোট চাকরির ১৬/১৭ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে সবাইকে অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষার ফিটলিস্ট তৈরিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া।

* প্রমোশন কাঠামোয় ন্যায্যতা ও যুক্তিসঙ্গত বিষয়ভিত্তিক রেশিও প্রথা সংস্কার

* বেসরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি নিশ্চিত

বেসরকারি শিক্ষাখাতের বিদ্যমান জটিলতা ও অদক্ষতা দূর করে এটিকে গতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও ফলপ্রসূ করতে হলে সাহসী ও যুগোপযোগী সংস্কার অপরিহার্য।

সর্বজনীন বদলি নীতি, অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ এবং যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা—এই তিনটি মৌলিক সংস্কার একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হবে।

ফলে শিক্ষার্থীরা পাবে উন্নত শিক্ষা, শিক্ষকরা ফিরে পাবেন মর্যাদা ও উদ্দীপনা, আর সরকারি অর্থ ব্যয় হবে পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূভাবে।

একটি আলোকিত, নৈতিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে একটি যোগ্য, অনুপ্রাণিত ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষক সমাজই হচ্ছে সর্বশক্তিশালী চালিকাশক্তি।

তাই এখনই সময় এই নীতিমালাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাখাতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের সূচনা করার।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ,ফরিদপুর।

Email : mmrrajbari71@gmail.com

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

বেসরকারি শিক্ষার উন্নয়নে তিন অস্ত্র : সর্বজনীন বদলি, যোগ্য নেতৃত্ব ও একীভূতকরণ

প্রকাশের সময় : ০৯:২৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

শিক্ষা জাতির মৌলিক ভিত্তি—আর সেই ভিত্তিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, জবাবদিহি এবং গুণগত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগীদের দাবির প্রতিফলন হিসেবে সর্বজনীন বদলি প্রথা এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। একই সাথে সরকার অচিরেই অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করতে যাচ্ছে।

এই দুটি যুগান্তকারী নীতি শিক্ষার মানোন্নয়ন, সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষক ব্যবস্থাপনায় ন্যায় ও দক্ষতা নিশ্চিত করবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতএব, বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে একটি বাস্তবসম্মত অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে।

বদলি ব্যবস্থা: স্থবিরতা ভেঙে উন্নয়নের পথে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ না থাকায় বহু শিক্ষক বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। এতে—

* পেশাগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়

* একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় ও কর্মউদ্দীপনা কমে যায়

* জনবল বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়

* ছাত্রবিহীন জায়গায় শিক্ষক থাকা এবং ছাত্রসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট তৈরি হয়

* সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে

* স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে

এই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর করতে সর্বজনীন বদলি নীতি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সর্বজনীন বদলি ব্যবস্থা চালু হলে—

* ছাত্রসংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষক বণ্টন সম্ভব হবে

* নন-পারফর্মিং প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস সম্ভব হবে

* কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে

* পেশাগত বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতার উন্নয়ন ঘটবে

* সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হবে

* শিক্ষকরা স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে না

ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন গতি আসবে এবং শিক্ষকতার মর্যাদা ও উৎসাহ বাড়বে।

অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ: নীতিগত সাহসী পদক্ষেপ

দেশে বর্তমানে ২৮ হাজারেরও বেশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী নেই; আবার কোথাও শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক নেই। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করতেই সরকার একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করছে।

মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই অসঙ্গতি দূর করতে সরকার অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহ :

* মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ

* শিক্ষার্থী উপস্থিতি, শিক্ষক সংখ্যা ও কার্যক্রম যাচাই

* তালিকা প্রণয়ন

* নিকটবর্তী কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূতকরণ

সম্ভাব্য সুফল:

* শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে

* শিক্ষক সংকট নিরসন হবে

* অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার হবে

* ভুয়া এমপিও ও অপচয় রোধ হবে

* সরকারি ব্যয় সাশ্রয় হবে

* সাশ্রয়কৃত অর্থ শিক্ষার উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে

* শিক্ষকরা স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে না

যদিও এতে কিছু প্রশাসনিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে, তবুও সুশাসন ও নীতির দৃঢ় প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠান প্রধানের দক্ষতা: সুশাসনের চালিকাশক্তি

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তার নেতৃত্ব—বিশেষ করে অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক। তাই প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও নেতৃত্ব গুণই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে নেতৃত্বের মান নির্ণায়ক ভূমিকা রাখে—এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য।

প্রস্তাবনা:

* একাডেমিক যোগ্যতা, সার্ভিস রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা নিয়ন্ত্রণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কাজের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন

* নেতৃত্বগুণ, সততা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা

* বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় কার্যকর দক্ষতা

* পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ

* গবেষণাকর্ম ও নিবন্ধ প্রকাশনা অগ্রাধিকার

* সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অগ্রগতিমূলক কাজে সক্রিয়তা

এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার পরিবেশ হবে আরও মানসম্মত।

প্রমোশন বৈষম্য: রেশিও সংস্কার ও উচ্চ পদ সৃষ্টি জরুরি

বর্তমান অমানবিক ও অযৌক্তিক বিষয়ভিত্তিক রেশিও প্রথা চালু থাকায় বহু মেধাবী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা  পদোন্নতি বৈষম্যের বেশি  শিকার হচ্ছেন।

জনবল কাঠামো অনুযায়ী  ডিগ্রী অধিভুক্ত কলেজে আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজিতে দুজন করে শিক্ষক পায় এবং অন্যান্য ঐচ্ছিক বিষয়েও দু’জন করে (ডিগ্রিতে বিষয় অনুমোদন সাপেক্ষে)। ডিগ্রিতে বিষয় অনুমোদন না থাকলে একজন। ফলে অধিকাংশ ডিগ্রি অধিভুক্ত কলেজে বিষয়ভিত্তিক একজন সহকারী অধ্যাপক পদ থাকায় বাংলা ও ইংরেজিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং  বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এ সমস্যা আরও জটিল হয় যখন দেখি, বেসরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদই সৃষ্টি করা হয়নি, যার ফলে শিক্ষকদের ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত লক্ষ্যই অনুপস্থিত। এর ফলে হতাশা বাড়ছে ও কর্মউদ্দীপনা কমছে, যা শিক্ষার গুণগত পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমাধান প্রস্তাব:

* নির্দিষ্ট চাকরিকাল শেষেই সবার প্রমোশন নিশ্চিত করা

* একাডেমিক রেজাল্ট, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া

* বেসরকারি কলেজগুলোতে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করা

* বৈষম্য দূর করে উদ্দীপনামূলক পদোন্নতি কাঠামো দ্রুত তৈরি ও বাস্তবায়ন করা

এতে শিক্ষক সমাজে উৎসাহ ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং পেশাটিতে প্রতিভাবান তরুণদের আগ্রহও বাড়বে।

মূল সুপারিশসমূহ :

* সর্বজনীন বদলি ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন

* অকার্যকর প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা

* অধ্যক্ষ নিয়োগে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক মানদণ্ড

* অধিকতর যোগ্য প্রার্থী পেতে  মোট চাকরির ১৬/১৭ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে সবাইকে অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষার ফিটলিস্ট তৈরিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া।

* প্রমোশন কাঠামোয় ন্যায্যতা ও যুক্তিসঙ্গত বিষয়ভিত্তিক রেশিও প্রথা সংস্কার

* বেসরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি নিশ্চিত

বেসরকারি শিক্ষাখাতের বিদ্যমান জটিলতা ও অদক্ষতা দূর করে এটিকে গতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও ফলপ্রসূ করতে হলে সাহসী ও যুগোপযোগী সংস্কার অপরিহার্য।

সর্বজনীন বদলি নীতি, অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ এবং যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা—এই তিনটি মৌলিক সংস্কার একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হবে।

ফলে শিক্ষার্থীরা পাবে উন্নত শিক্ষা, শিক্ষকরা ফিরে পাবেন মর্যাদা ও উদ্দীপনা, আর সরকারি অর্থ ব্যয় হবে পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূভাবে।

একটি আলোকিত, নৈতিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে একটি যোগ্য, অনুপ্রাণিত ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষক সমাজই হচ্ছে সর্বশক্তিশালী চালিকাশক্তি।

তাই এখনই সময় এই নীতিমালাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাখাতে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তরের সূচনা করার।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ,ফরিদপুর।

Email : mmrrajbari71@gmail.com