Dhaka ১২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
যুদ্ধের খরচ জোগাতে পর্নোগ্রাফিকে বৈধ করার কথা ভাবছে ইউক্রেন জাবিতে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষের আগেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ আমরা জাতীয় পার্টির মতো পোষা বিরোধী দল হবো না: সারজিস অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জব্বার ভূঞাসহ পাঁচ আইন কর্মকর্তার পদত্যাগ ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, কালুখালীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি কাজে-কর্মে স্মরণীয় ইউএনও মুস্তাফিজুর, বিদায়ে আবেগঘন পরিবেশ কালীগঞ্জে প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় ক্লিনিক সিলগালা, জরিমানা ১ লাখ নিয়ন্ত্রণে আসছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, শনাক্তে থাকবে কিউআর কোড: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাংশায় ইসলামী চক্ষু হাসপাতালের নতুন ভিশন সেন্টার উদ্বোধন এক উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদের ভোট একসঙ্গে

জাবিতে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষের আগেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

জাবি প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : ১০:১৭:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 20

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারকাজে দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে অর্থ উত্তোলন পর্যন্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার এ প্রকল্পে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) ব্যবহার করে হল প্রশাসনের পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, দরপত্র আহ্বানের তথ্য গোপন এবং কাজ শুরুর আগেই বিল জমা দিয়ে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

জাবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের রিটেনশন মানির মুনাফা থেকে মাঠ সংস্কারে ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে দরপত্র আহ্বান বা এ-সংক্রান্ত কোনো টিম গঠনের সঙ্গে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের সম্পৃক্ততা নেই।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে মূল্যায়ন টিম গঠনের কথা থাকলেও এ প্রকল্পে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ ও ডেপুটি কম্পট্রোলার আবু মোহাম্মদ কাওছারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কারও প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই বলে জানা গেছে। মাঠের কাজ তদারকির জন্য পৃথক কোনো কমিটিও গঠন করা হয়নি।

পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের অভিযোগ, উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ সীমিত রেখে এলটিএম পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরপত্রের নোটিশও গোপন রাখা হয় বলে তাদের দাবি। সরেজমিনে হলের নোটিশ বোর্ডেও এ-সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের সভাপতি শহিদ বলেন, ‘সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো কাজের টেন্ডার হলে আমরা ক্যাম্পাসের লাইসেন্স করা সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানতে পারি। অনেকদিন ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল মাঠের কাজের টেন্ডার হবে শুনে আসছি। কিন্তু টেন্ডার কখন দেওয়া হলো, তা আমিও জানি না, অন্যরাও জানে না।’

দরপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প অফিস এলটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করেছে। ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’ কাজ করছে এবং হল প্রশাসন শুধু কাজটি তদারক করবে।

তবে এ দাবি নাকচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দপ্তরের উপপরিচালক ফাহমিদা মাছউদ বলেন, মাঠের টেন্ডার বা ঠিকাদার নিয়োগ প্রকল্প দপ্তর করেনি। এটি সম্পূর্ণ হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। টেন্ডার ছাড়া এত টাকার কাজ হওয়ার সুযোগ নেই। কে বা কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তা তাদের জানানো হয়নি।

অন্যদিকে হল প্রশাসনের দাবি, যথাসময়ে টেন্ডার আহ্বান ও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাধ্যক্ষ ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর কথা বললেও মাঠে কাজ করছেন আবুল হোসেন নামের এক ঠিকাদার। তিনি ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে কাজ করছেন বলে জানান। সরকারি কাজ করার বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই বলেও তিনি নিজেই স্বীকার করেন।

লেকপাড়ের মাটি দিয়ে মাঠ ভরাট

গত ২৫ ও ২৬ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে থেকে মাটি না এনে হলের পশ্চিম পাশের গেরুয়া লেকের পাড়ের মাটি কেটে মাঠ ভরাট করা হচ্ছে। এ সময় মাঠের পূর্ব পাশে রবীন্দ্র চত্বরসংলগ্ন দুটি কৃষ্ণচূড়া গাছও কেটে ফেলা হয়েছে।

ঠিকাদার আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি অরুণাপল্লীতে কাজ করতাম। আমি সরাসরি স্যারের (প্রাধ্যক্ষ) কাছ থেকে কাজটা নিছি। কোনো টেন্ডারও আমি নিইনি। হল থেকে যেভাবে দেখায়, আমি সেভাবে কাজ করছি।’

কাজে আনুমানিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা লাগতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, কাজের জন্য তার সঙ্গে মোট টাকার কোনো চুক্তি হয়নি।

কাজ শুরুর আগেই ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন

মাঠের সংস্কারকাজ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হারুন বলেন, ‘যে টাকার কথা বলছেন, সেটা আমি আবার জমা দিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত চলছে।’

তবে কার কাছে ও কবে অর্থ জমা দিয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাঠের কাজ শুরু বা শেষ হয়েছিল কি না, তা তারা জানতেন না। তবে কাজ শেষ করার বিল জমা দিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে প্রকল্পের পুরো অর্থ ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেক গত ১৯ আগস্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে গেছে।

কাজ শেষ না করে অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে হারুন বলেন, ‘অনিয়ম ও টাকার বিষয়টি তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে আমি এখন আর কথা বলব না।’

এদিকে কাজ শুরুর আগেই অর্থ উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম আড়াল করতে দ্রুত মাঠের সংস্কারকাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনের ওপর চাপ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রশাসনের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে বৃষ্টির মধ্যেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে।

তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

গত ২৬ আগস্ট একাধিক গণমাধ্যমে মাঠের দরপত্রে অনিয়মের খবর প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহবুব কবির জানান, রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার চাপ থাকলেও সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে সাত দিন সময় নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

কাজ শুরুর আগেই অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় ঠিকাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনা করে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।

লেকপাড়ের মাটি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান, বিভিন্ন নির্মাণকাজে কেটে রাখা মাটি আনা হয়েছে এবং পরে তার ওপর মাটি দিয়ে রোলার করা হবে। তবে প্রকল্পের শিডিউলে বিষয়টি ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে গেলে এরপর হলের শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে হল সংসদের জিএস মাহমুদুল হাসান ইমন (বাবু) লেখেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট পজিটিভ, রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জমা দেওয়া হবে। ভিসি পারমিশন দিলেই কাজ শুরু হবে।’ এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম বলেন, ‘টেন্ডার ছাড়া প্রশাসনিক কাজ হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, জবাবদিহিতা থাকে না। তদন্তের মাধ্যমে এই অনিয়মের সত্যতা সামনে আসুক।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে মুঠোফোন ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

জাবিতে মাঠ সংস্কারের কাজ শেষের আগেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

প্রকাশের সময় : ১০:১৭:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংলগ্ন খেলার মাঠ সংস্কারকাজে দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে অর্থ উত্তোলন পর্যন্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকার এ প্রকল্পে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) ব্যবহার করে হল প্রশাসনের পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, দরপত্র আহ্বানের তথ্য গোপন এবং কাজ শুরুর আগেই বিল জমা দিয়ে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

জাবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের রিটেনশন মানির মুনাফা থেকে মাঠ সংস্কারে ৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে দরপত্র আহ্বান বা এ-সংক্রান্ত কোনো টিম গঠনের সঙ্গে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের সম্পৃক্ততা নেই।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে মূল্যায়ন টিম গঠনের কথা থাকলেও এ প্রকল্পে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ ও ডেপুটি কম্পট্রোলার আবু মোহাম্মদ কাওছারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কারও প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই বলে জানা গেছে। মাঠের কাজ তদারকির জন্য পৃথক কোনো কমিটিও গঠন করা হয়নি।

পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের অভিযোগ, উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ সীমিত রেখে এলটিএম পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরপত্রের নোটিশও গোপন রাখা হয় বলে তাদের দাবি। সরেজমিনে হলের নোটিশ বোর্ডেও এ-সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের সভাপতি শহিদ বলেন, ‘সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো কাজের টেন্ডার হলে আমরা ক্যাম্পাসের লাইসেন্স করা সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানতে পারি। অনেকদিন ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল মাঠের কাজের টেন্ডার হবে শুনে আসছি। কিন্তু টেন্ডার কখন দেওয়া হলো, তা আমিও জানি না, অন্যরাও জানে না।’

দরপত্র নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প অফিস এলটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করেছে। ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’ কাজ করছে এবং হল প্রশাসন শুধু কাজটি তদারক করবে।

তবে এ দাবি নাকচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দপ্তরের উপপরিচালক ফাহমিদা মাছউদ বলেন, মাঠের টেন্ডার বা ঠিকাদার নিয়োগ প্রকল্প দপ্তর করেনি। এটি সম্পূর্ণ হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। টেন্ডার ছাড়া এত টাকার কাজ হওয়ার সুযোগ নেই। কে বা কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তা তাদের জানানো হয়নি।

অন্যদিকে হল প্রশাসনের দাবি, যথাসময়ে টেন্ডার আহ্বান ও নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাধ্যক্ষ ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর কথা বললেও মাঠে কাজ করছেন আবুল হোসেন নামের এক ঠিকাদার। তিনি ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে কাজ করছেন বলে জানান। সরকারি কাজ করার বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই বলেও তিনি নিজেই স্বীকার করেন।

লেকপাড়ের মাটি দিয়ে মাঠ ভরাট

গত ২৫ ও ২৬ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বাইরে থেকে মাটি না এনে হলের পশ্চিম পাশের গেরুয়া লেকের পাড়ের মাটি কেটে মাঠ ভরাট করা হচ্ছে। এ সময় মাঠের পূর্ব পাশে রবীন্দ্র চত্বরসংলগ্ন দুটি কৃষ্ণচূড়া গাছও কেটে ফেলা হয়েছে।

ঠিকাদার আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি অরুণাপল্লীতে কাজ করতাম। আমি সরাসরি স্যারের (প্রাধ্যক্ষ) কাছ থেকে কাজটা নিছি। কোনো টেন্ডারও আমি নিইনি। হল থেকে যেভাবে দেখায়, আমি সেভাবে কাজ করছি।’

কাজে আনুমানিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা লাগতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, কাজের জন্য তার সঙ্গে মোট টাকার কোনো চুক্তি হয়নি।

কাজ শুরুর আগেই ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন

মাঠের সংস্কারকাজ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই প্রকল্পের পুরো অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ‘হারুন এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হারুন বলেন, ‘যে টাকার কথা বলছেন, সেটা আমি আবার জমা দিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত চলছে।’

তবে কার কাছে ও কবে অর্থ জমা দিয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাঠের কাজ শুরু বা শেষ হয়েছিল কি না, তা তারা জানতেন না। তবে কাজ শেষ করার বিল জমা দিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে প্রকল্পের পুরো অর্থ ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেক গত ১৯ আগস্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে গেছে।

কাজ শেষ না করে অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে হারুন বলেন, ‘অনিয়ম ও টাকার বিষয়টি তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে আমি এখন আর কথা বলব না।’

এদিকে কাজ শুরুর আগেই অর্থ উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম আড়াল করতে দ্রুত মাঠের সংস্কারকাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনের ওপর চাপ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রশাসনের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে বৃষ্টির মধ্যেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে।

তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

গত ২৬ আগস্ট একাধিক গণমাধ্যমে মাঠের দরপত্রে অনিয়মের খবর প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহবুব কবির জানান, রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার চাপ থাকলেও সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে সাত দিন সময় নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

কাজ শুরুর আগেই অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় ঠিকাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনা করে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বিস্তারিত জানা যাবে।

লেকপাড়ের মাটি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান, বিভিন্ন নির্মাণকাজে কেটে রাখা মাটি আনা হয়েছে এবং পরে তার ওপর মাটি দিয়ে রোলার করা হবে। তবে প্রকল্পের শিডিউলে বিষয়টি ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে গেলে এরপর হলের শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ মেসেঞ্জার গ্রুপে হল সংসদের জিএস মাহমুদুল হাসান ইমন (বাবু) লেখেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট পজিটিভ, রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জমা দেওয়া হবে। ভিসি পারমিশন দিলেই কাজ শুরু হবে।’ এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম বলেন, ‘টেন্ডার ছাড়া প্রশাসনিক কাজ হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, জবাবদিহিতা থাকে না। তদন্তের মাধ্যমে এই অনিয়মের সত্যতা সামনে আসুক।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে মুঠোফোন ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।