Dhaka ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুগ্ধ-সিদ্ধার্থই হত্যাকারী, ছাদে হত্যা করা হয় তিনজনকে: পুলিশ

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০২:০৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 9

 

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। দুই আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। আর তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তবে সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির অংশবিশেষ পড়ে শোনান পুলিশ কমিশনার।

জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ দাস বলেন, ‘আগে মাঝেমধ্যে উৎসব হলে ইয়াবা খাইতাম। গত এক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একটা করে ইয়াবা খাই। ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরের সময়। সম্প্রতি আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর প্রাইভেসির জন্য সে বিজয় কাকুর বাসায় ছয়-সাত মাস ধরে ঘুমায়। খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় থাকে, বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমায়। গত এক মাস ধরে বৃহস্পতিবার সীমান্তদের বাসায় থাকে। সীমান্ত নেশা করে না। ঘটনার বিষয়েও কিছু জানে না।’

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে করে সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে তারা তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে কামাল কাছনার ইয়াবা কারবারি শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। পরে আরও চারটি ইয়াবা নেন। ইয়াবা কেনার জন্য সিদ্ধার্থ নিজের মোবাইল ফোনটি বন্ধক রাখেন।

পুলিশের দাবি, ইয়াবা নেওয়ার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আবার সীমান্তের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হলে রাস্তায় কুকুর দেখতে পান তারা। তখন প্রাচীর টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে ঢোকেন। এরপর দেবুদের বাড়ির ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদটি চারদিকে হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে ছাদ দেখা যেত না। তারা সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে আবার ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে তারা খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ওই রাতে তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করলেও সেদিন রাতে তারা এর চেয়ে অনেক বেশি ইয়াবা সেবন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সিদ্ধার্থ।

পুলিশের দাবি, সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। এ সময় তিনি দুজনকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’

পুলিশ কমিশনার জানান, নিজেদের ‘মান-সম্মান’ বাঁচাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতিকে গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তার মরদেহ ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে এলে তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ গামছা দিয়ে গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ এক হাতে তার মেয়ের গলা এবং অন্য হাতে মুখ চেপে ধরেন।

গণপতির স্ত্রীকে হত্যার পর একই গামছা দিয়ে দুজন মিলে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন। এতে তার মৃত্যু না হলে পাশেই কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে গলায় পেঁচানো হয়। পরে দুই দিক থেকে টান দিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে পান গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠেছেন। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

পুলিশের দাবি, এ সময় তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার আশঙ্কা করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর ছাদে পড়ে থাকা একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। পরে গণপতির মরদেহ ছাদের এক পাশে রাখা টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

হত্যাকাণ্ডের পর দুই আসামি ক্লান্ত হয়ে গোসল করেন। এরপর সেখানেই থাকা আরও একটি ইয়াবা সেবন করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে মুগ্ধ পরিকল্পনা করেন। এরপর তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, মুগ্ধ ঘর থেকে স্বর্ণালঙ্কার এনে দিলে সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। পরে বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেন তারা।

জুমার নামাজের সময় গণপতির বাড়ির ছাদ হয়ে দেবুদের বাড়ির ছাদে যান দুই আসামি। এরপর দেয়াল টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। মুগ্ধ টাকা এবং সিদ্ধার্থ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যান। পরে সেগুলো গোপন করার চেষ্টা করেন তারা।

পুলিশের ভাষ্য, পরে সিদ্ধার্থ মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা নিজের মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন তিনি।

পুলিশ কমিশনার জানান, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। আদালতের অনুমতি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, হত্যার সময় আসামিদের চিৎকার শুনেছিলেন এক প্রতিবেশী নারী। ওই নারী বিষয়টি পুলিশকে জানান। তবে পুলিশের কাছে ঘটনা জানানোর কারণে তার স্বামী তাকে মারধর করেন বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দিও আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এসব জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।

ময়নাতদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

নিহত দুই নারী, আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মরদেহের ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, গলায় শ্বাসরোধ বা ফাঁস লাগার ঘটনায় মরদেহ থেকে বীর্য ও মলমূত্র বের হয়ে আসতে পারে। এটি বাইরের বীর্য নয়, মরদেহের ভেতর থেকেই বের হয়। একইভাবে গলায় ফাঁস লাগলে চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসার মতো শারীরিক পরিবর্তনও ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সাংবাদিকরা মামলার তদন্ত, হত্যার উদ্দেশ্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করেন। দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর অন্য সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

মুগ্ধ-সিদ্ধার্থই হত্যাকারী, ছাদে হত্যা করা হয় তিনজনকে: পুলিশ

প্রকাশের সময় : ০২:০৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

 

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। দুই আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। আর তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তবে সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির অংশবিশেষ পড়ে শোনান পুলিশ কমিশনার।

জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ দাস বলেন, ‘আগে মাঝেমধ্যে উৎসব হলে ইয়াবা খাইতাম। গত এক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার একটা করে ইয়াবা খাই। ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ভোরের সময়। সম্প্রতি আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর প্রাইভেসির জন্য সে বিজয় কাকুর বাসায় ছয়-সাত মাস ধরে ঘুমায়। খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় থাকে, বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমায়। গত এক মাস ধরে বৃহস্পতিবার সীমান্তদের বাসায় থাকে। সীমান্ত নেশা করে না। ঘটনার বিষয়েও কিছু জানে না।’

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে করে সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে তারা তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে কামাল কাছনার ইয়াবা কারবারি শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। পরে আরও চারটি ইয়াবা নেন। ইয়াবা কেনার জন্য সিদ্ধার্থ নিজের মোবাইল ফোনটি বন্ধক রাখেন।

পুলিশের দাবি, ইয়াবা নেওয়ার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আবার সীমান্তের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হলে রাস্তায় কুকুর দেখতে পান তারা। তখন প্রাচীর টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে ঢোকেন। এরপর দেবুদের বাড়ির ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদটি চারদিকে হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে ছাদ দেখা যেত না। তারা সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে আবার ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে তারা খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। ওই রাতে তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করলেও সেদিন রাতে তারা এর চেয়ে অনেক বেশি ইয়াবা সেবন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সিদ্ধার্থ।

পুলিশের দাবি, সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। এ সময় তিনি দুজনকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’

পুলিশ কমিশনার জানান, নিজেদের ‘মান-সম্মান’ বাঁচাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতিকে গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তার মরদেহ ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে এলে তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ গামছা দিয়ে গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ এক হাতে তার মেয়ের গলা এবং অন্য হাতে মুখ চেপে ধরেন।

গণপতির স্ত্রীকে হত্যার পর একই গামছা দিয়ে দুজন মিলে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করেন। এতে তার মৃত্যু না হলে পাশেই কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে গলায় পেঁচানো হয়। পরে দুই দিক থেকে টান দিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে পান গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠেছেন। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

পুলিশের দাবি, এ সময় তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার আশঙ্কা করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর ছাদে পড়ে থাকা একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেন তারা। পরে গণপতির মরদেহ ছাদের এক পাশে রাখা টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

হত্যাকাণ্ডের পর দুই আসামি ক্লান্ত হয়ে গোসল করেন। এরপর সেখানেই থাকা আরও একটি ইয়াবা সেবন করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে মুগ্ধ পরিকল্পনা করেন। এরপর তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, মুগ্ধ ঘর থেকে স্বর্ণালঙ্কার এনে দিলে সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। পরে বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেন তারা।

জুমার নামাজের সময় গণপতির বাড়ির ছাদ হয়ে দেবুদের বাড়ির ছাদে যান দুই আসামি। এরপর দেয়াল টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। মুগ্ধ টাকা এবং সিদ্ধার্থ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যান। পরে সেগুলো গোপন করার চেষ্টা করেন তারা।

পুলিশের ভাষ্য, পরে সিদ্ধার্থ মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা নিজের মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন তিনি।

পুলিশ কমিশনার জানান, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। আদালতের অনুমতি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, হত্যার সময় আসামিদের চিৎকার শুনেছিলেন এক প্রতিবেশী নারী। ওই নারী বিষয়টি পুলিশকে জানান। তবে পুলিশের কাছে ঘটনা জানানোর কারণে তার স্বামী তাকে মারধর করেন বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দিও আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এসব জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার।

ময়নাতদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি ময়নাতদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

নিহত দুই নারী, আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মরদেহের ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, গলায় শ্বাসরোধ বা ফাঁস লাগার ঘটনায় মরদেহ থেকে বীর্য ও মলমূত্র বের হয়ে আসতে পারে। এটি বাইরের বীর্য নয়, মরদেহের ভেতর থেকেই বের হয়। একইভাবে গলায় ফাঁস লাগলে চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসার মতো শারীরিক পরিবর্তনও ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সাংবাদিকরা মামলার তদন্ত, হত্যার উদ্দেশ্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করেন। দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর অন্য সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।