১০ লাখে কিডনি বিক্রির পর দিনমজুর পেলেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা
- প্রকাশের সময় : ১০:১২:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 19
দারিদ্র্যেতার সুযোগ নিয়ে মন্টু মিয়া নামে এক দিনমজুরকে ১০ লাখ টাকার লোভ দেখিয়ে নেপালে নিয়ে কিডনি ট্রান্সফারের পর দেশে ফিরে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে দালালদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় কিডনি বিক্রেতা শরীরের অঙ্গহানির আইনে জয়পুরহাট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার বাদী পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া। তিনি গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫ এ মামলার আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন মামলাটি কালাই থানায় এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন, বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী। এদের মধ্যে তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের মহাজন হিসেবে পরিচিত। তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় থেকে জয়পুরহাটে দালাল নিয়োগ দিয়ে দরিদ্র মানুষদের টাকার লোভ দেখিয়ে দেশে-বিদেশে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় করে আসছেন।
দিনমজুর মন্টু মিয়াকে ১০ লাখ টাকার লোভ দেখিয়ে নেপালে নিয়ে কিডনি ট্রান্সফারের পর দেশে ফিরে হাতে দেওয়া হয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। দিবো-দিচ্ছি বলে কালক্ষেণ করে বাকি টাকা আর পাননি তিনি। দীর্ঘদিন সময় অপেক্ষার পরও কিডনি বিক্রির চুক্তির টাকা না পেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, সংসারের অভাব-অনটন মেটাতে বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। টাকা নেওয়ার পর সময়মতো কিস্তি ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পারায় তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। এই সুযোগে স্থানীয় দালালরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং একটি কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। এ সময় তাঁকে জানানো হয়, ঢাকার এক নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন এবং তাঁর জন্য জরুরি কিডনির প্রয়োজন। একটি কিডনির বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এমন আশ্বাস পেয়ে মন্টু মিয়া রাজি হন।
দিনমজুর মন্টু মিয়ার অভিযোগ, দালালদের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর আসামিরা তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করে দেয় এবং চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে চুক্তির বাহিরে ৫০ হাজার টাকা দেয়। এর কয়েকদিন পর তাঁকে ভারত হয়ে নেপালে নেওয়া হয়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি ট্রান্সফার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিন চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর চুক্তির ১০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয় কয়েকজন লোকের মাধ্যমে ওই টাকা পাওয়ার জন্য অভিযুক্তদের অনুরোধ করা হলেও তারা উল্টো অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। এতে বাধ্য হয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন।
দিনমজুর মন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, কিডনি ট্রান্সফারের পর থেকে তিনি আগের মতো কাজকর্ম করতে পারেন না। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
জয়পুরহাট আদালতের আইনজীবী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, মানুষের দারিদ্র্যতা, অসহায়ত্ব বা আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে যদি কাউকে বিদেশে নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কিডনি ট্রান্সফার করা হয়, তাহলে এটি শুধু প্রতারণা নয়, অত্যন্ত জঘন্য ও সংগঠিত অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন-সংক্রান্ত আইনের আওতায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।




















