Dhaka ০৩:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

আড়িয়াল বিলের কইসহ ৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ১২:১২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 7

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যভাণ্ডার আড়িয়াল বিলের পাঁচ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকেরা। এসব মাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে।

গবেষকেরা বলছেন, বর্তমানে এসব মাছ খাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, জলজ বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটিকে আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর—এই পাঁচটি স্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় কই, বাটা, মেনি বা ভেদা, গুলশা টেংরা ও পুঁটি—এই পাঁচ প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০টি এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা পাওয়া গেছে।

কইয়ের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এরপর রয়েছে মেনি ও গুলশা টেংরা। সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। আবার ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণা মাছের পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে মাংসপেশিতেও পৌঁছাতে পারে।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১ দশমিক ৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২ দশমিক ৩৩ থেকে ১২৭ দশমিক ৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষা মৌসুমে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। গবেষকদের ধারণা, বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের জনবসতি, বাজার, কৃষিজমি ও নালা-খাল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য বিলে এসে পড়ে। পরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এসব কণা তলদেশে জমা হয়।

ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটি-আইআর) স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশই মাইক্রোফাইবার বলে পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি ও মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল এসব কণার অন্যতম উৎস।

এ ছাড়া ভাঙা শক্ত প্লাস্টিক, পলিথিনের ফিল্ম ও ফোমজাতীয় কণাও শনাক্ত হয়েছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিকার্বোনেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য নদী ও সংযোগ খালে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা স্থাপন, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সুতা ও জালের ব্যবহার বন্ধ, উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বিলসংলগ্ন এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করেছেন তারা।

গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আড়িয়াল বিলের মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ না থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

আড়িয়াল বিলের কইসহ ৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

প্রকাশের সময় : ১২:১২:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যভাণ্ডার আড়িয়াল বিলের পাঁচ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকেরা। এসব মাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে।

গবেষকেরা বলছেন, বর্তমানে এসব মাছ খাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, জলজ বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটিকে আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর—এই পাঁচটি স্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় কই, বাটা, মেনি বা ভেদা, গুলশা টেংরা ও পুঁটি—এই পাঁচ প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০টি এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা পাওয়া গেছে।

কইয়ের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এরপর রয়েছে মেনি ও গুলশা টেংরা। সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। আবার ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণা মাছের পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে মাংসপেশিতেও পৌঁছাতে পারে।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১ দশমিক ৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২ দশমিক ৩৩ থেকে ১২৭ দশমিক ৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষা মৌসুমে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। গবেষকদের ধারণা, বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের জনবসতি, বাজার, কৃষিজমি ও নালা-খাল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য বিলে এসে পড়ে। পরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এসব কণা তলদেশে জমা হয়।

ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটি-আইআর) স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশই মাইক্রোফাইবার বলে পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি ও মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল এসব কণার অন্যতম উৎস।

এ ছাড়া ভাঙা শক্ত প্লাস্টিক, পলিথিনের ফিল্ম ও ফোমজাতীয় কণাও শনাক্ত হয়েছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিকার্বোনেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য নদী ও সংযোগ খালে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা স্থাপন, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সুতা ও জালের ব্যবহার বন্ধ, উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বিলসংলগ্ন এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করেছেন তারা।

গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আড়িয়াল বিলের মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ না থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে।