চুরি আর ভিডিও’র অপবাদ দিয়ে যুবককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা
- প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ মে ২০২৫
- / 172
চুরি আর ভিডিও করার অপবাদ দিয়ে শাহীন শেখ (২৭) নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার রাতে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে সামসুদ্দিন বিশ^াস ওরফে সাম বিশ^াসের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শাহীন একই গ্রামের জিন্নাহ শেখের ছেলে। তারা খুবই হতদরিদ্র। পেশায় সে একজন কৃষক ছিল। প্রতিবেশি সামসুদ্দিন বিশ^াস এবং তার স্বজনরা শাহীনকে হত্যা করেছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের। সামসুদ্দিন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক রাজবাড়ী শাখায় পিওন পদে চাকরি করেন। এলাকায় তিনি প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতেই রাজবাড়ী সদর থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বাদী নিহতের মামা কালাম মোল্লা। মামলার ব্যাপারে তিনি জানেননা বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। যেকারণে মামলার এজাহারের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়শার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ রাতেই চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলো একই গ্রামের জহিরুদ্দিন বিশ^াস, মৈজদ্দি বিশ^াস, ফরহাদ বিশ^াস ও মুন্নু মোল্লা।
শুক্রবার দুপুরে নিহত শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা টিনের ছাপড়া ঘর, পাটকাঠি দিয়ে তৈরি বেড়া ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে শুধু কাঠের একটি চৌকি। পুরো পরিবার থানায় অবস্থান করায় বাড়িতে এলাকাবাসীর ভিড়। অভিযুক্ত সামসুদ্দিন বিশ^াসের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী রাহেলা পারভীন দাবি করেন, আমাদের বাড়ির মোটর চুরি করেছে শাহিন। আবার আমার বৌমার ভিডিও করেছে। এজন্য আমার ছেলে ও অন্যরা তাকে মারধর করেছে। বাড়ির ভেতরে তখন অনেক লোক ছিল। গণপিটুনিতে মারা গেছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শাহীনের দুরসম্পর্কের নানী আমেনা খাতুন জানান, তিনি বসন্তপুর ইউনিয়নের একজন গ্রাম পুলিশ। সামসুদ্দিন বিশ^াসের পরিবারের কারো ভিডিও করেছে এমন অভিযোগ তুলে গত বুধবার শাহীন শেখকে ধরে নিয়ে মারধর করে সামসুদ্দিন বিশ^াস তাদের বাড়িতে বেঁধে রাখে। পরে কৌশলে বাঁধন খুলে পালিয়ে যায় শাহীন। এরপর সামসুদ্দিন বিশ^াস শাহীনের মাকে গিয়ে বলে আসেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছেলে হাজির করবে নইলে গ্রামছাড়া করা হবে। নিরুপায় হয়ে শাহীনের মা শাহীনকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর সালিশ বসার কথা ছিল। তার আগেই সামসুদ্দিন বিশ^াসের স্বজনরা শাহীনদের বাড়িতে গিয়ে শাহীনকে ধরে নিয়ে যায়। শাহীনকে সামসুদ্দিন বিশ^াসের বাড়ির একটি ঘরে আটকে রেখে বেধরক পেটানো হয়। তার আর্তচিৎকার ভেসে আসছিল। এসময় আশে পাশে অনেক মানুষ জড়ো হয়। কিন্তু কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। তিনি নিজে ঘরে যেতে চাইলে সামসুদ্দিন বিশ^াসের ভাই মুক্তার বিশ^াস তাকে বাধা দেন। তিনি তখন বলেন, এভাবে একজনকে মারা ঠিক না। দেশে তো আইন কানুন আছে। মুক্তার বিশ^াস জবাব দেন আইন কানুন পরে দেখা যাবে। এর কিছুক্ষণ পর শাহীনকে ঘর থেকে অচেতন অবস্থায় বের করা হয়। ঘরে রক্ত ছিল। সেই রক্ত তিনি বাইরে থেকে মুছতে দেখেছেন। ওরা একজন গ্রাম্য ডাক্তারকে ডেকে শাহীনকে দেখায়। ডাক্তার কী বলেছিল তা তিনি জানেন না। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ওরাই শাহীনকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
নিহত শাহীনের ভগ্নিপতি আবু তাহের জানান, ওরা ভিডিও করার মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। শাহীনের একটি বাটন ফোন আছে। এন্ড্রয়েড ফোন নেই। ও ভিডিও করবে কী দিয়ে। শাহীনের অবুঝ দুটি মেয়ে আছে। ওদের এখন ভবিষ্যৎ কী?
নিহত শাহীনের বাবা জিন্নাহ শেখ জানান, তিন মাস আগে সামসুদ্দিন বিশ^াসের একটি মটর হারিয়ে যায়। সে এখন ভিডিওর কথা বলে তার ছেলেকে ধরেছে। গত বুধবার তার ছেলেকে মারধর করে। মারের ভয়ে সে পালিয়ে আমার কাছে মানিকগঞ্জ যায়। আমি তখন মানিকগঞ্জ ছিলাম। পরদিন শাহীনের মা ফোন করে বলে সালিশ বসবে। ছেলেকে নিয়ে আসতে হবে। তিনি তখন বলেন, যদি সালিশ হয় তাহলে নিয়ে আসবো। সালিশ না হলে আর আনবো না। শাহীনের মা বলে সালিশই হবে। সালিশের জন্য ছেলেকে নিয়ে আসেন। শুক্রবার বিকেলে তিনি মাতবরদের ডাকতে বাইরে যান। এই ফাঁকে সামসুদ্দিন বিশ^াসের ছেলে গিয়ে শাহীনকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে যায়। সামসুদ্দিনদের বাড়ির একটি ঘরে আটকে রেখে লাঠি, সোঠা, চেয়ারের পায়া, হাতুড়ি দিয়ে পেটায়। ছেলের চিৎকারে তিনি যেতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া হয়। অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে দেখেছে। কেউ কিছু বলল না। ছেলের চিৎকারে আমি তখন পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলাম। সালিশদাররা পরে সেখানে গিয়ে এ অবস্থা দেখে সামসুদ্দিনদের ভর্ৎসনা করেন।
তিনি বলেন, এ হত্যার সাথে সামসুদ্দিন বিশ^াস, তার ভাই মুক্তার, রাসেল, কচি, রাফিজুল, সৌরভ জড়িত। যে চারজনকে ধরে এনেছে ওরা সালিশ করতে গিয়েছিল। রাতে পুলিশ আমার শ্যালককে ধরে এনে সই রেখে ছেড়ে দেয়। কী কারণে সই রেখেছে সেটা কালাম জানে না। পরে শুনি মামলা হয়েছে। আমি তাকে মামলা করতে বলিনি।
মামলার বাদী কালাম মোল্লা জানান, মামলার বিষয়টি তিনি জানতেন না। পুলিশ তাকে সই করতে বলায় তিনি করেছেন।
সামসুদ্দিন বিশ^াসের কর্মস্থল রাজবাড়ী কৃষি ব্যাংকে গিয়ে জানা যায়, অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি ছুটি নিয়েছেন। এজন্য শনিবার ব্যাংকে আসেননি। তার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কল দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এসএমএস পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
রাজবাড়ী সদর থানার ওসি মাহমুদুর রহমান বলেন, সামসুদ্দিন বিশ^াসের বাড়ির মোটর হারিয়েছিল। চোর সন্দেহে শাহীনকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টা খুবই হৃদয় বিদারকক। যারা মেরেছে তারা এলাকায় খুবই প্রভাবশালী। বাদীপক্ষ ওদের ভয়ে খুবই ভীত সন্ত্রস্ত। তারা রাতে মামলার এজাহার দিয়ে গেছে। এখন ওরা আবার পক্ষাবলম্বন করে কীনা। কী বলব।
বাদী বলছেন তিনি মামলার বিষয়ে জানেন না? এ প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, এটা হয়ত ভয়ে বলছে। শাহীনের বাবার অভিযোগের বিষয়ে বলেন, মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭/৮ জন রয়েছে। আসামিদের মধ্যে চারজনকে ধরা হয়েছে। বাকীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। যারা জড়িত তাদের সবাইকে ধরা হবে। রাজবাড়ী জেলা পুলিশ শতভাগ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছে।
শাহীনের মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।






















