‘১২ তারিখে টাকা পাঠাবে বলেছিল, তার আগেই আগুনে পুড়ে ছেলেটা মারা গেল’

- প্রকাশের সময় : ০২:০১:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / 12

সংগৃহীত ছবি
‘শাহিন ফোন দিয়ে বলেছিল, মা, আমি কিছু ফল কিনে খাই। আমাকে কিছু টাকা পাঠাও। শাহিন বলেছিল, মা, ১২ তারিখে টাকা পাঠাব। ফল কিনে খেয়ো। কিন্তু তার আগেই আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেল। আমার বুকের ধন আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি একা হয়ে গেলাম। এখন আমি বাঁচব কী করে?’—এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকায় শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় শোকে মুহ্যমান মা নার্গিস বেগম। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও অপেক্ষা করছেন শাহিনের মরদেহ একনজর দেখার জন্য।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছরের এক ছেলে, আট মাস বয়সী এক মেয়ে ও ষাটোর্ধ্ব মাকে। বিদেশে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় শাহিনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ পরিবার ও স্বজনেরা।
শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহিনের বয়স যখন চার বছর, তখন তার বাবা মারা যান। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে সে। বিয়ের পর সংসারের স্বচ্ছলতার আশায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল। মৃত্যুর তিন দিন আগে প্রথমবারের মতো টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছিল। ১২ তারিখে ৩২ হাজার টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং বাকি টাকা সংসারের কেনাকাটায় খরচ করতে বলেছিল। কিন্তু টাকা পাঠানোর আগেই আগুনে পুড়ে প্রাণ হারাল ছেলেটি।
শাহিনের মামা আব্দুস সালাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভাগ্নে অনেক পরিশ্রমী ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর বোন অনেক কষ্ট করে শাহিনকে মানুষ করেছেন। ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার পর যখন টাকা পাঠানো শুরু করার কথা, তখনই তার মৃত্যু হলো। এতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। তিনি পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারগুলোকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ দেশে আনা হয়। শনিবার বাকি সাতজনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁর বাসিন্দা।
নওগাঁর নিহত পাঁচজন হলেন—নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।



















