বিসর্জনে বিদায় দেবী দুর্গার, ঘাটে ঘাটে জনস্রোত

- প্রকাশের সময় : ০৯:৩১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / 10

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে নদীর ঘাট, সমুদ্রসৈকত ও বিসর্জনস্থলে মানুষের ঢল। কোথাও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, কোথাও সিঁদুর খেলা, আবার কোথাও অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষবারের মতো দেবীকে প্রণাম। আনন্দ, আবেগ আর বিষাদের মিশেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিমা বিসর্জন। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলার বিসর্জনস্থলে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থী। ঢাকের তালে তালে শোভাযাত্রা, ভক্তদের প্রার্থনা আর ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
রাজধানীর পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজঘাটে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ঢাকের বাদ্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। অন্যদিকে, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বের হওয়া বিজয়া শোভাযাত্রাও নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিসর্জনস্থলের দিকে এগিয়ে যায়। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে দেখা যায় আবেগঘন পরিবেশ।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে সমবেত হন বিপুলসংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ধর্মীয় সংগীতের আবহে সাগরের জলে একে একে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। ঢেউয়ের গর্জন আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে সৈকতজুড়ে তৈরি হয় উৎসব ও বিদায়ের এক অনন্য আবহ।
দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় বিসর্জন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় প্রতিমা নিয়ে আসেন পূজারিরা। সমুদ্রসৈকতে সমবেত হন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সৈকত পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলনমেলায়। সাগরের নোনাজলে প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরেও তিলাই নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে ভক্ত ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। পৌর শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা শোভাযাত্রার মাধ্যমে নদীর তীরে নেওয়া হয়। পরে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয় দুর্গোৎসবের শেষ পর্ব।
বিসর্জনের আগে দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয় বিজয়া দশমীর পূজা, দর্পণ বিসর্জন ও অন্যান্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। অনেক মণ্ডপে বিবাহিত নারীরা সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। দেবীকে সিঁদুর ও মিষ্টি নিবেদন করে পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তারা কামনা করেন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পরে ঢাকঢোল বাজিয়ে, শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় নির্ধারিত বিসর্জনস্থলে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা প্রতিবছর সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসেন ভক্তদের কল্যাণ ও অশুভ শক্তির বিনাশের বার্তা নিয়ে। পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে তিনি ফিরে যান কৈলাসে। তাই প্রতিমা বিসর্জন শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, ভক্তদের কাছে এটি প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর মতো আবেগঘন মুহূর্ত।
বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তের চোখে ছিল বিদায়ের অশ্রু, আবার কণ্ঠে ছিল আগামী বছর দেবীর ফিরে আসার প্রত্যাশা। প্রতিমা জলে নিমজ্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় কয়েক দিনের পূজা, আনন্দ-উৎসব ও মিলনমেলা। তবে দেবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা আবেগ, স্মৃতি ও সম্প্রীতির বার্তা থেকে যায় মানুষের মনে।
দুর্গোৎসবের এই বিদায়পর্বে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমী হয়ে ওঠে সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য উপলক্ষ।
ঢাকের শেষ তাল, শঙ্খের শেষ ধ্বনি আর নদী-সমুদ্রের জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন দেবী দুর্গা। রেখে গেলেন শান্তি, কল্যাণ ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রত্যাশা। ভক্তদের কণ্ঠে তাই শেষ পর্যন্ত ধ্বনিত হলো সেই চিরচেনা আহ্বান—‘আসছে বছর আবার হবে।’




















