শূন্য থেকে শিখরে: কত সম্পদ রেখে গেলেন নানা পাটেকার
- প্রকাশের সময় : ০৮:২২:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 4
উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি কখনোই তথাকথিত প্রথাগত সুপুরুষ কিংবা গ্ল্যামারসর্বস্ব ‘সুপারস্টার’ ছিলেন না; ছিলেন খাঁটি অভিনয় প্রতিভা, ধারালো সংলাপ আর অনবদ্য ব্যক্তিত্বের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সূর্য ওঠার আগেই পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে দেহত্যাগ করেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত ও জ্যেষ্ঠ অভিনেতা নানা পাটেকার। স্বজন বা চলচ্চিত্রশিল্পে কোনো ধরনের সংযোগ ছাড়া, কেবল নিজস্ব মেধা, অদম্য ইচ্ছা ও কঠোর সংগ্রামের জোরে শূন্য থেকে নিজেকে দেশসেরা অভিনেতাদের সারিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকার স্মৃতিচারণ করে নানা পাটেকর জানিয়েছিলেন, জীবনের শুরুর দিকে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিদিন স্কুল শেষে মুম্বাইয়ের চুনাভাট্টি এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন তিনি। সেখানে সিনেমার পোস্টার রঙ করার কাজ করে মাসে উপার্জন করতেন মাত্র ৩৫ রুপি, আর বিনিময়ে মিলত দিনে মাত্র একবেলা খাবার।
অভিনেতার ভাষ্যমতে, তার বাবার ব্যবসায়িক সম্পত্তি হারিয়ে যাওয়ার পরেই পরিবারের আর্থিক অবস্থা মারাত্মক রূপ নেয় এবং পুরো পরিবার তীব্র সংকটে পড়ে। সেই ছোটবেলার অভিজ্ঞতা অনাহার ও তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তার মানসিক চাপ তার ভেতরে দীর্ঘকাল স্থায়ী ছিল। তবে কৈশোরের সেই চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের দিনগুলো থেকে পরবর্তীতে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে কয়েক দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মাধ্যমে তিনি যে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিলেন—তা এক রূপকথাকেও হার মানায়।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক হিসাব ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৬০ কোটি থেকে ৮০ কোটি রুপিতে।
নানা পাটেকারের এই ‘শূন্য থেকে শিখরে’ পৌঁছানোর গল্পটি ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। শৈশবের তীব্র আর্থিক অনটনের কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই তাকে কাজের সন্ধানে নামতে হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে তার অভিষেক ঘটে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্মানিত অভিনেতায় পরিণত হন। ‘পারিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘আব তাক ছাপ্পান’, ‘নটসম্রাট’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলো তাকে ঘরে ঘরে পরিচিতি ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
অভিনয়জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি তার অর্থমূল্যের পরিধিও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। গণমাধ্যমের তথ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের শেষদিকের বছরগুলোতে তিনি ছবিপ্রতি প্রায় ২ কোটি থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং ব্র্যান্ড সম্পর্কিত কাজ থেকেও তার ভালো অঙ্কের আয় হতো। তবে তার এই অর্জিত বিপুল সম্পদ কেবল সিনেমা ও বিনোদনজগতের উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
সম্পদ ও প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও জীবনযাপনে চরম সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর স্বভাবের জন্য তিনি সবার নজর কেড়েছিলেন। কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও বহু বছর ধরে তিনি মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে অবস্থিত মাত্র ৭৫০ বর্গফুটের এক কামরার একটি অ্যাপার্টমেন্টেই বসবাস করতেন। কয়েক দশক আগে মাত্র ১.১ লাখ রুপিতে কেনা সেই সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি রুপি।
এ ছাড়াও গোয়ায় তার একটি নিজস্ব বাড়ি ছিল এবং পুনের খড়কওয়াসলার কাছে অবস্থিত প্রায় ২৭ একরের বিশাল ফার্ম হাউসটি ছিল তার অন্যতম প্রধান স্থাবর সম্পত্তি। এই খামারবাড়িতে তিনি নিয়মিত প্রথাগত কৃষিকাজ পরিচালনা করতেন এবং সেখানে গম ও ধানের মতো বিভিন্ন ফসলের চাষ করা হতো।
একইভাবে, বলিউডের অন্য তারকাদের বিলাসবহুল যানবাহনের বহরের তুলনায় নানা পাটেকারের ব্যবহৃত গাড়ির সংগ্রহটিও ছিল বেশ মার্জিত ও বাস্তবসম্মত। তার সংগ্রহে ছিল একটি মহিন্দ্রা জিপ সিজে৪, একটি মহিন্দ্রা স্করপিও এবং একটি অডি কিউ৭।
তবে কোনো প্রাচুর্য বা বিলাসী জীবনযাপন কখনোই নানা পাটেকারের জীবনযাত্রার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারেনি। জানা যায়, একবার ১.৫ কোটি রুপি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তাব তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সে সময় তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, গাড়ির পেছনে এত বিপুল অর্থ ব্যয় না করে সেই টাকা দিয়ে চরম সংকটে থাকা কৃষকদের সাহায্য করা অনেক বেশি যুক্তিসংগত। সারা জীবন তিনি নিজের এই পরিমিত ঘরবাড়ি, প্র্যাকটিক্যাল জীবনযাত্রার অনুসঙ্গ এবং অতি সাধারণ জীবনধারার সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন।
নানা পাটেকারের কাছে দারিদ্র্য থেকে প্রাচুর্যের এই দীর্ঘ যাত্রাটি ব্যাংকের গচ্ছিত হিসাবের কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি প্রায়ই বলতেন, শৈশবের সেই কঠিন ও সংগ্রামের দিনগুলোই অর্থ, খাদ্য এবং প্রকৃত সাফল্যকে দেখার ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে তৈরি করে দিয়েছিল।
সূত্র: এনডিটিভি




















