জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই: হাইকোর্ট
- প্রকাশের সময় : ১২:৪২:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 13
কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে দেওয়া এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।
মামলার রিটকারী মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন ও বিধি জোরপূর্বক বা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী আলকাছ উদ্দিন আহমেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এর পরদিন তিনি কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানিয়ে লিখিত আবেদন করেন তিনি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তাকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয়। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রটির কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরে গত ২০ আগস্ট আদালত রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন।
রায়ে আদালত বলেন, আলকাছ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের আইনগত কোনো বৈধতা ছিল না। তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে ও চাকরিতে বহাল রাখতে আইনগতভাবে বাধ্য ছিল। ফলে তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের অধিকারী।
আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের প্রস্তাবিত শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন কিংবা বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে। বোর্ডের জারি করা নির্দেশনা সংশ্লিষ্টদের জন্য বাধ্যতামূলক।
আদালতের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবায়ন না করাকে অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এমন আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার বিধানের পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেন হাইকোর্ট।
রায়ে সংশ্লিষ্টদের আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য-সচিবের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও রয়েছে।























