বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য, পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে সিফাত
- প্রকাশের সময় : ০৭:৪২:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 1
নিজের বাসায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে আটক আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহকে শেষ পর্যন্ত একটি পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানা পুলিশ।
তবে তাকে আটকের কারণ, সম্ভাব্য মামলা এবং শেষ পর্যন্ত যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে—এসব বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তব্যে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। এতে তার গ্রেফতারের প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকার বাসা থেকে সিফাত আব্দুল্লাহকে আটক করে পুলিশ। তিনি রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি নিজের বাসায় প্রায় দুই মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে বিদ্যুৎ বিল ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ পুলিশের।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে পুলিশ সিফাতকে আটক করে।
সিফাতকে আটকের পর বৃহস্পতিবার রাতে গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি ও অশালীন ভাষায় বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। একই সময় তিনি জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সংক্রান্ত আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই অভিযোগে নতুন কোনো মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি। বরং শুক্রবার তাকে একটি পূর্বের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিফাত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং এ কারণেও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একইসাথে তাকে পুরনো একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর কথা জানানো হয়।
ফলে শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগ, এরপর তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতির কথা এবং সবশেষে পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার—একই ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যে এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো: ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, সিফাতের বক্তব্যের বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনগত অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমেই তা নির্ধারণ করা হবে। সিফাতের ক্ষেত্রেও পুলিশের কাছে আসা তথ্য যাচাই করে প্রকৃত বিষয় উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
তবে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সিফাতের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশের দাবির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে জানা যায়নি।
সিফাতকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতে গাছা থানায় এনসিপি ও বিএনপির নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। এনসিপির নেতাকর্মীরা সিফাতের মুক্তির দাবি জানান। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি করেন।
এ সময় থানার ভেতরে ও বাইরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বাগ্বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
সিফাত আব্দুল্লাহর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের এমপি সালাউদ্দিন আইউবী।
নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনার দায়ে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার ভাষা বা শব্দচয়ন আপত্তিকর হলেও বিদ্যুৎ নিয়ে তার ক্ষোভের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সালাউদ্দিন আইউবী বলেন, ‘একদিকে ভয়াবহ লোডশেডিং, অন্যদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল—এ অবস্থায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।’
তিনি অবিলম্বে সিফাতকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান এবং লোডশেডিং ও জনদুর্ভোগ নিরসনে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও গাজীপুর-২ আসনের সাবেক ১১ দলীয় জোট মনোনীত এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, ‘সিফাতের বক্তব্যের ভাষা বা শব্দচয়ন আপত্তিকর হয়ে থাকলে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তাকে একটি পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘কথাবার্তার জন্য কাউকে আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কিন্তু একটি তরুণকে পুরনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী।’
আলী নাসের খান বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবস্থা কাম্য নয়, যেখানে তরুণদের বক্তব্য বা সমালোচনাকে দমন করার জন্য ভিন্ন মামলার আশ্রয় নেয়া হবে। তবে একইসাথে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি সিফাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার স্বচ্ছ তদন্ত, তার আইনগত অধিকার নিশ্চিত এবং অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিফাত আব্দুল্লাহর স্থায়ী বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া এলাকায়। তার বাবার নাম সেকান্দর আলী। বর্তমানে তিনি গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকায় বসবাস করছিলেন এবং রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করছেন।




















