পশ্চিমবঙ্গে ফাঁকা গরুর হাট, নেই ক্রেতা; নতুন নিয়ম ঘিরে আতঙ্ক
- প্রকাশের সময় : ০৫:১৭:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / 22
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার অন্যতম প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৫০ সালের ‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের এই আকস্মিক ও কঠোর অবস্থানের ফলে রাজ্যজুড়ে খামারি এবং গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নতুন এই নিয়মে বলা হয়েছে, কেবল ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সের গবাদি পশু আইনিভাবে জবাই করা যাবে। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের কাছ থেকে যৌথভাবে জবাইয়ের উপযুক্ত হওয়ার ফিটনেস সনদ নিতে হবে।
এই নতুন নির্দেশনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকাতার অদূরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের ঘোষপাড়া এলাকার খামারিদের ওপর। স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১০টি গরু কিনেছিলেন সাধন ঘোষ নামের এক খামারি। আশা ছিল, আসন্ন কোরবানির ঈদে ৯টি গরু বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধন আক্ষেপ করে জানান, এখন প্রতিটি গরুর খাবারের পেছনেই প্রতিদিন তাকে ৫০০ রুপি করে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, যা তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই এলাকার অপর খামারি ৩৩ বছর বয়সী ভাস্কর ঘোষের ২২টি গরুর মধ্যে ১৫টি তিনি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ৫ শতাংশ সুদে ৭ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া ভাস্কর জানান, প্রতি বছর এই সময়ে তারা সেই গরুগুলো বিক্রি করে দেন যেগুলোর দুধ কমে গেছে বা যারা বাচ্চা দিতে পারে না। তাদের দাদুর আমল থেকে এই নিয়ম চলে আসলেও এবার হঠাৎ করে ১৯৫০ সালের সেই পুরোনো আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কথা তিনি আগে কখনো শুনেননি। কোরবানির ঈদ সাধারণত তাদের জন্য বেশি লাভের সময় হলেও, এবার গরু বিক্রি করতে না পেরে এবং প্রতিদিন খাবারের জোগান দিতে গিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।
ঘোষপাড়া থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী পোলেরহাট গরুর হাটে সাধারণ সময়ে দিনে প্রায় ২ হাজার গরু কেনা-বেচা হতো। বিশেষ করে আগামী ২৭ ও ২৮ মে কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে এই সময়ে হাটে উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিশাল এই হাটে মাত্র ২০-২৫টি গরু দেখা যাচ্ছে। গবাদি পশুর সঠিক বয়স নির্ধারণ অর্থাৎ ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এবং আইন লঙ্ঘনের পরিণতির আশঙ্কায় পোলেরহাটের মতো বড় বড় গরুর হাট এখন প্রায় জনশূন্য। খাঁ খাঁ রোদে বিক্রেতারা অলস সময় পার করছেন এবং মানুষ এখন আইনি জটিলতার ভয়ে ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে ছাগল ও ভেড়ার দিকেই ঝুঁকছে।
হাটের এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকাতার খুচরা বাজারে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ২৮০ টাকা থেকে এক লাফে ৬০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যালকাটা বিফ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, টাংরার সরকারি কসাইখানাটি কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই গত দুই দিন ধরে বন্ধ রয়েছে, যার ফলে বাজারে মাংসের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে শুধু কলকাতা চিড়িয়াখানার প্রাণীদের খাবারের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন দুটি মহিষ জবাই করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন এখন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) নেতা এবং ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি পঞ্চায়েত পর্যায়ে দ্রুত পশু চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন, যাতে খামারিরা সহজে প্রয়োজনীয় সনদ পেতে পারেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৩ মে-র ওই বিজ্ঞপ্তির কারণে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ১৯৫০ সালের আইনের ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা যে রাজ্য সরকারের হাতে রয়েছে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।
নওশাদ সিদ্দিকীর আগে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীও মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এই বিষয়ে নিজের ‘অস্বস্তি ও বিভ্রান্তি’র কথা তুলে ধরেছিলেন। মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জেলা কর্তৃপক্ষকে দ্রুত নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ ও চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে মানুষ সেখানে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী রীতিনীতি পালন করতে পারে। এদিকে নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ শফিক কাসমি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ১৯৫০ সালের আইন হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়ার আগে সকল অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা উচিত ছিল। তিনি সরকারকে জনগণের জীবন সহজ করার পথ খোঁজার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, শাসক দল বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহা বিষয়টিকে একটি মহৎ উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে তিনি বলেন, একটি বৃহত্তর মহৎ কাজের জন্য কিছু মানুষকে কিছুটা অস্বস্তি সহ্য করতে হয়। বাবা-মা বৃদ্ধ হলে কেউ তাদের বিক্রি করে দেয় না, তাই দীর্ঘ ভাবনাচিন্তার পর বিদ্যমান একটি আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়েছে। তবে সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্যের তত্ত্বে সান্ত্বনা পাচ্ছেন না সাধারণ খামারিরা। আকস্মিক এই নিয়মের বেড়াজালে পড়ে ৪৮ বছর বয়সী অপর্ণা ঘোষের মতো অনেক ক্ষুদ্র খামারিই মনে করছেন, নিয়ম মানার জন্য সরকারকে অন্তত তাদের কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস




















