Dhaka ০৬:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভালো বেতন ছাড়া আদর্শ টেকে না : শিক্ষকের দারিদ্রে নৈতিক অবক্ষয়

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৫:১৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / 265

বাংলাদেশে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সমাজে যাদের হাতে গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই শিক্ষকদের জীবনযাত্রা আজ নানা সংকটে জর্জরিত। এই সংকট কেবল আর্থিক নয়—এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক এক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, শিক্ষাকে সেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) সুপারিশ করেছে, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা উচিত। এই বরাদ্দের উদ্দেশ্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও মর্যাদা নিশ্চিত করে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা নৈতিকভাবে দৃঢ় থেকে সমাজে মূল্যবোধ জাগাতে পারেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের এখনো ১৩ তম গ্রেডে রাখা হয়েছে।সম্প্রতি প্রাইমারি শিক্ষকদের  রাজপথে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে  সরকার ১১ তম গ্রেড দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । সরকারি বেতন কাঠামোয় তাঁরা নিম্ন আয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত—যদিও অধিকাংশই স্নাতক কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। গ্রেড অনুযায়ী শিক্ষকদের মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সর্বসাকল্যে একজন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক মাসে পান প্রায় ১৯ হাজার টাকার মতো।২০১৫ সালের বেতন স্কেলে প্রাথমিক শিক্ষকদের দৈনিক টিফিন ভাতা এখনো মাত্র সাড়ে ছয় টাকা—যা এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়নের প্রতীক। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাবই ফেলছে না; এটি পেশাগত সুযোগ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ অবস্থাকে শিক্ষা বিশ্লেষকরা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র যখন শিক্ষকদের জীবনের ন্যূনতম মান বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নৈতিক আদর্শ চর্চাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদ এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ—দুটিরই বেতন গ্রেড একই, অর্থাৎ ১০ম। জীবনযাত্রার মানে আছে বিপুল পার্থক্য। একটি পেশা নানা বাড়তি সুযোগ-সুবিধা, ভাতা ও সামাজিক ক্ষমতায় স্বচ্ছল জীবনযাপন করে, অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে দিন গুনে বেঁচে থাকে।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একজন সাব-ইন্সপেক্টর দশম গ্রেডে যোগদান করেও কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে শেষ পর্যন্ত এএসপি পদমর্যাদায় পৌঁছানোর সুযোগ পান। অন্যদিকে, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেই সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা প্রদর্শন করেও তাঁর জন্য কোনো উর্ধ্বপদে উত্তরণের পথ খোলা নেই; পদোন্নতির পথ কার্যত বন্ধ। এ এক চরম বৈষম্য, যা শিক্ষক সমাজ গভীর ক্ষোভের সঙ্গে অনুভব করছেন।

শুধু সরকারি শিক্ষকই নন, বেসরকারি কলেজেও একই ধরনের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। সরকারি কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদক্রম থাকলেও বেসরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদই শেষ ধাপ। এই পদক্রমহীনতা শিক্ষকদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে, যা তাঁদের কাছে চরম বৈষম্যমূলক ও মনোবলহানিকর বলে প্রতীয়মান। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও তাঁরা প্রাপ্য মর্যাদা ও পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সুতরাং, বেসরকারি কলেজে কর্মরত শিক্ষকগণ মনে করেন—অচিরেই সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। এতে শিক্ষকরা কর্মদক্ষতা ও শিক্ষাগত মানোন্নয়নে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে পারবেন, ফলে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন ঘটবে এবং মেধাবীরা এই পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

বাস্তবে, এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষকদের কোচিং পরিচালনা, ইন্সুরেন্স এর মধ্যস্থতাকারী ও ছোটখাটো ব্যবসার মতো বিকল্প আয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান কমছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিং নির্ভরতা বাড়ছে, আর অভিভাবকদের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ। অর্থাৎ, শিক্ষকরা যখন টিকে থাকার সংগ্রামে বাধ্য হচ্ছেন, তখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য পিছিয়ে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং জাতির মূল্যবোধকেও ধীরে ধীরে নষ্ট করছে। একজন শিক্ষক যখন অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন, তখন তাঁর কাছে শিক্ষার আদর্শিক ভূমিকা গৌণ হয়ে যায়—প্রধান হয়ে ওঠে টিকে থাকার সংগ্রাম।

ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন এ বিষয়ে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মন্তব্য করেছেন, “শিক্ষকদের আর্থিক দুরবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, তাঁরা আদর্শবান থাকার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগও হারাচ্ছেন।” তিনি মনে করেন, শিক্ষাখাতে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে এই অবস্থা অনেকাংশে পরিবর্তন করা সম্ভব।

একই মত প্রকাশ করেন সারদা সুন্দরী স্কুল, ফরিদপুরের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তাঁর মতে, “শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার, যাতে তাঁরা আর্থিক চিন্তা না করে শ্রেণিকক্ষের উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে পারেন। একই সাথে, শিক্ষকের একটি মৌলিক প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন, যেখানে একজন শিক্ষক সত্যিকার অর্থে নৈতিক এবং আদর্শিকভাবে একজন সুশিক্ষক হয়ে উঠবেন।”

আরেকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি শাহানারা পারভিন শিউলি বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ি, কিন্তু নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি—এটাই আমাদের বাস্তবতা।”

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকরা যে আর্থিক ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত, তা কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়—এটি জাতির ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত। শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবহেলা; তাদের দুর্দশা আসলে আমাদের সামষ্টিক নৈতিক পরাজয়ের প্রতিফলন।

আজ যখন একজন শিক্ষক নিজের জীবনের ন্যূনতম মর্যাদা রক্ষায় সংগ্রাম করেন, তখন সমাজের কাছে তাঁর অবস্থান এক নীরব প্রশ্নের মতো। তাঁর মুখে উচ্চারিত না হলেও সেই প্রশ্ন আমাদের সবাইকে ভাবায়—“যাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ, তাদেরই যদি সবচেয়ে অবহেলিত রাখা হয়, তাহলে সেই ভবিষ্যৎ কার হাতে নিরাপদ?”

সুবিধা প্রাপ্তির পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের জায়গাটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থের চেয়েও এখন বেশি জরুরি শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, শিক্ষাকে যদি সব ধরনের অপশক্তি, বিশেষ করে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা না যায়, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষা কাঠামোর পরিবর্তন কিংবা কারিকুলাম সংশোধনের মতো সিদ্ধান্ত কখনোই টেকসই হতে পারে না।

কারণ,শিক্ষা এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য এক হওয়া উচিত—মানসম্মত ও মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা।

শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল সংস্কার এখন শুধু প্রয়োজন নয়—এটি এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি সত্যিই উন্নত ও সুশিক্ষিত জাতি গড়তে চায়, তবে শিক্ষককে প্রথমেই তাঁর যোগ্য মর্যাদা ও নিশ্চিন্ত জীবন দিতে হবে।

নিঃসন্দেহে, শিক্ষক কেবল পেশাজীবী নন—তিনি জাতির নৈতিক দিকনির্দেশক, তিনি ভবিষ্যতের স্থপতি। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা মানে, জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করা।

আজ যদিআমরা সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাই, তবে একদিন আমাদের সন্তানরাই প্রশ্ন করবে—“যারা আমাদের শেখাতেন, তাদের শেখানোর অধিকারটুকু কেন আমরা রক্ষা করিনি?”

রাষ্ট্র যদিএখনই শিক্ষকদের সম্মান, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে না আনে, তবে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—আর সেই অনুর্বর ভূমিতে প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ভালো বেতন ছাড়া আদর্শ টেকে না : শিক্ষকের দারিদ্রে নৈতিক অবক্ষয়

প্রকাশের সময় : ০৫:১৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সমাজে যাদের হাতে গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সেই শিক্ষকদের জীবনযাত্রা আজ নানা সংকটে জর্জরিত। এই সংকট কেবল আর্থিক নয়—এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক এক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, শিক্ষাকে সেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) সুপারিশ করেছে, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা উচিত। এই বরাদ্দের উদ্দেশ্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও মর্যাদা নিশ্চিত করে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা নৈতিকভাবে দৃঢ় থেকে সমাজে মূল্যবোধ জাগাতে পারেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের এখনো ১৩ তম গ্রেডে রাখা হয়েছে।সম্প্রতি প্রাইমারি শিক্ষকদের  রাজপথে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে  সরকার ১১ তম গ্রেড দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । সরকারি বেতন কাঠামোয় তাঁরা নিম্ন আয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত—যদিও অধিকাংশই স্নাতক কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। গ্রেড অনুযায়ী শিক্ষকদের মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সর্বসাকল্যে একজন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক মাসে পান প্রায় ১৯ হাজার টাকার মতো।২০১৫ সালের বেতন স্কেলে প্রাথমিক শিক্ষকদের দৈনিক টিফিন ভাতা এখনো মাত্র সাড়ে ছয় টাকা—যা এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়নের প্রতীক। এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাবই ফেলছে না; এটি পেশাগত সুযোগ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ অবস্থাকে শিক্ষা বিশ্লেষকরা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র যখন শিক্ষকদের জীবনের ন্যূনতম মান বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নৈতিক আদর্শ চর্চাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদ এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ—দুটিরই বেতন গ্রেড একই, অর্থাৎ ১০ম। জীবনযাত্রার মানে আছে বিপুল পার্থক্য। একটি পেশা নানা বাড়তি সুযোগ-সুবিধা, ভাতা ও সামাজিক ক্ষমতায় স্বচ্ছল জীবনযাপন করে, অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে দিন গুনে বেঁচে থাকে।

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একজন সাব-ইন্সপেক্টর দশম গ্রেডে যোগদান করেও কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে শেষ পর্যন্ত এএসপি পদমর্যাদায় পৌঁছানোর সুযোগ পান। অন্যদিকে, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেই সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা প্রদর্শন করেও তাঁর জন্য কোনো উর্ধ্বপদে উত্তরণের পথ খোলা নেই; পদোন্নতির পথ কার্যত বন্ধ। এ এক চরম বৈষম্য, যা শিক্ষক সমাজ গভীর ক্ষোভের সঙ্গে অনুভব করছেন।

শুধু সরকারি শিক্ষকই নন, বেসরকারি কলেজেও একই ধরনের বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। সরকারি কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদক্রম থাকলেও বেসরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদই শেষ ধাপ। এই পদক্রমহীনতা শিক্ষকদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে, যা তাঁদের কাছে চরম বৈষম্যমূলক ও মনোবলহানিকর বলে প্রতীয়মান। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও তাঁরা প্রাপ্য মর্যাদা ও পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সুতরাং, বেসরকারি কলেজে কর্মরত শিক্ষকগণ মনে করেন—অচিরেই সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। এতে শিক্ষকরা কর্মদক্ষতা ও শিক্ষাগত মানোন্নয়নে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে পারবেন, ফলে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন ঘটবে এবং মেধাবীরা এই পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

বাস্তবে, এই আর্থিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষকদের কোচিং পরিচালনা, ইন্সুরেন্স এর মধ্যস্থতাকারী ও ছোটখাটো ব্যবসার মতো বিকল্প আয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান কমছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিং নির্ভরতা বাড়ছে, আর অভিভাবকদের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ। অর্থাৎ, শিক্ষকরা যখন টিকে থাকার সংগ্রামে বাধ্য হচ্ছেন, তখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার আদর্শিক লক্ষ্য পিছিয়ে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং জাতির মূল্যবোধকেও ধীরে ধীরে নষ্ট করছে। একজন শিক্ষক যখন অর্থনৈতিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন, তখন তাঁর কাছে শিক্ষার আদর্শিক ভূমিকা গৌণ হয়ে যায়—প্রধান হয়ে ওঠে টিকে থাকার সংগ্রাম।

ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন এ বিষয়ে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মন্তব্য করেছেন, “শিক্ষকদের আর্থিক দুরবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, তাঁরা আদর্শবান থাকার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগও হারাচ্ছেন।” তিনি মনে করেন, শিক্ষাখাতে যথাযথ বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে এই অবস্থা অনেকাংশে পরিবর্তন করা সম্ভব।

একই মত প্রকাশ করেন সারদা সুন্দরী স্কুল, ফরিদপুরের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তাঁর মতে, “শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার, যাতে তাঁরা আর্থিক চিন্তা না করে শ্রেণিকক্ষের উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে পারেন। একই সাথে, শিক্ষকের একটি মৌলিক প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন, যেখানে একজন শিক্ষক সত্যিকার অর্থে নৈতিক এবং আদর্শিকভাবে একজন সুশিক্ষক হয়ে উঠবেন।”

আরেকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি শাহানারা পারভিন শিউলি বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ি, কিন্তু নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি—এটাই আমাদের বাস্তবতা।”

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকরা যে আর্থিক ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত, তা কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়—এটি জাতির ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত। শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবহেলা; তাদের দুর্দশা আসলে আমাদের সামষ্টিক নৈতিক পরাজয়ের প্রতিফলন।

আজ যখন একজন শিক্ষক নিজের জীবনের ন্যূনতম মর্যাদা রক্ষায় সংগ্রাম করেন, তখন সমাজের কাছে তাঁর অবস্থান এক নীরব প্রশ্নের মতো। তাঁর মুখে উচ্চারিত না হলেও সেই প্রশ্ন আমাদের সবাইকে ভাবায়—“যাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ, তাদেরই যদি সবচেয়ে অবহেলিত রাখা হয়, তাহলে সেই ভবিষ্যৎ কার হাতে নিরাপদ?”

সুবিধা প্রাপ্তির পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের জায়গাটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থের চেয়েও এখন বেশি জরুরি শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।

এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, শিক্ষাকে যদি সব ধরনের অপশক্তি, বিশেষ করে রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা না যায়, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষা কাঠামোর পরিবর্তন কিংবা কারিকুলাম সংশোধনের মতো সিদ্ধান্ত কখনোই টেকসই হতে পারে না।

কারণ,শিক্ষা এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য এক হওয়া উচিত—মানসম্মত ও মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা।

শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল সংস্কার এখন শুধু প্রয়োজন নয়—এটি এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি সত্যিই উন্নত ও সুশিক্ষিত জাতি গড়তে চায়, তবে শিক্ষককে প্রথমেই তাঁর যোগ্য মর্যাদা ও নিশ্চিন্ত জীবন দিতে হবে।

নিঃসন্দেহে, শিক্ষক কেবল পেশাজীবী নন—তিনি জাতির নৈতিক দিকনির্দেশক, তিনি ভবিষ্যতের স্থপতি। শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা মানে, জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করা।

আজ যদিআমরা সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাই, তবে একদিন আমাদের সন্তানরাই প্রশ্ন করবে—“যারা আমাদের শেখাতেন, তাদের শেখানোর অধিকারটুকু কেন আমরা রক্ষা করিনি?”

রাষ্ট্র যদিএখনই শিক্ষকদের সম্মান, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে না আনে, তবে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—আর সেই অনুর্বর ভূমিতে প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।