কোচিং বাণিজ্যে শিক্ষকদের দৌরাত্ম্য: নীতিমালা আছে, বাস্তবায়ন নেই
- প্রকাশের সময় : ০৫:৫৭:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫
- / 140
দেশের শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকতার নৈতিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত “কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা” থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। ফলে স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের বড় একটি অংশ কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে করছে দুর্বল ও বাণিজ্যনির্ভর।
২০১২ সালের হাইকোর্ট নির্দেশনা অনুসারে ২০১৯ সালে সরকার কোচিং বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না।
অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো যাবে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের লিখিত অনুমতি নিয়ে।
কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালা কাগজে সীমাবদ্ধ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, এমনকি স্কুলের পাশেই শিক্ষকরা খুলে বসেছেন ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টার।
রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দেখা যায়,স্কুল শুরুর পুর্বে বা স্কুল ছুটির পর একই শ্রেণিকক্ষে কোচিং ক্লাস চলছে। অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাসে পাঠ অসম্পূর্ণ রাখেন, যাতে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এক শিক্ষার্থী জানায়,“স্যার ক্লাসে ঠিকভাবে বোঝান না। বলেন, কোচিংয়ে পড়লে বুঝব। যারা যায়, তারা ভালো নম্বর পায়— যারা যায় না, তারা উপেক্ষিত।”
রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতি শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ের জন্য দিতে হয় মাসে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা। একক টিউশনে এই খরচ বেড়ে যায় ১০ হাজার টাকায়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ছে চরম সংকটে ব্যাবসায়ী সাগর আহন্মেদ নামে এক অভিভাবক বলেন,
“দুই ছেলের প্রাইভেটের পেছনে মাসে ৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সংসারে টান পড়েছে।”অন্য এক অভিভাবকের অভিযোগ, “মেয়ে কোচিংয়ে যায় না বলে স্যার হুমকি দিয়েছেন— পরীক্ষায় বুঝে নেবে। বাধ্য হয়েই পাঠাতে হচ্ছে।”
ব্যানবেইসের তথ্য বলছে ভয়াবহ বাস্তবতা, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর ২০২৩ সালের তথ্যে দেখা যায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭২% শিক্ষক কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনে যুক্ত।এর মধ্যে ৫৩% শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরই পড়ান।৪৭% শিক্ষক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই ছুটির পর কোচিং চালান।নীতিমালায় নির্ধারিত ফি (উপজেলায় ১৫০ টাকা, জেলায় ২০০, মহানগরে ৩০০ টাকা) ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ছাড়ের বিধানও প্রায় কেউ মানছেন না।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই।প্রাইভেট কোচিং না করায় ছাত্র-ছাত্রকে পিটিয়েছেন এমন অভিযোগ ও পাওয়াযায়— যা শিক্ষকতার নৈতিকতার চরম অবক্ষয় বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।
রাজবাড়ীর সাংবাদিক সমীর কান্তি বিশ্বাস বলেন,
“শ্রেণিকক্ষ এখন সময় পার করার জায়গা, কোচিংই তাদের আসল আয়ের উৎস।”
এডভোকেট রোকনুজ্জামান বলেন,
“যেসব শিক্ষক ক্লাসে পাঠদান বাদ দিয়ে বাইরে কোচিং করান, তারা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের শত্রু।
তদারকির অভাবে অনিয়মের বিস্তার ঘটছে।
শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “একজন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অধীনে ৩০–৫০টি বিদ্যালয় থাকে। ফলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অসম্ভব।”
প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাবের কারণে অনেক শিক্ষক শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছেন, ফলে তারা নির্ভয়ে কোচিং ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি ও হতাশ প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।৬১% শিক্ষার্থী মনে করে কোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়।৪৩% শিক্ষার্থী ভয় পায় শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কম নম্বর দিতে পারেন।এই ভয় ও চাপের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা ও মানসিক ক্লান্তি দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন—
নীতিমালা ও আইন থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবেই কোচিং বাণিজ্য এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কার্যকর নজরদারি, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
তাদের মতে, “এখনই যদি কোচিং বাণিজ্য রোধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়বে। শিক্ষাব্যবস্থা হারাবে তার পবিত্রতা।”
নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই—
ফলে শিক্ষকতার মহৎ পেশা আজ অর্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পড়েছেন মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে,
আর জাতির মেরুদণ্ড— শিক্ষাব্যবস্থা— ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার শক্তি ও মর্যাদা।






















