Dhaka ০৭:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বামী-স্ত্রী নন, জামালপুরে গৃহবধূ হত্যার নেপথ্যে পরকীয়া ও ভিডিও ফাঁদ

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৬:২৩:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / 10

গত ২৩ আগস্ট জামালপুরে ভাড়া বাসায় ‘দুই সন্তানকে আটকে রেখে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুনের’ ঘটনার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে জানা গেছে নিহত ইসরাত জাহান মিমি ও কাউসার আহমেদ শাওন সর্ম্পকে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না। বরং তাদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়া সম্পর্ক চলছিল।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে শহরের বাগেরহাটা এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পিবিআই জামালপুরে পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত।

পিবিআই জানায়, গত ২৩ আগস্ট শনিবার সকাল ১০টার দিকে জামালপুর শহরের পাঁচরাস্তা মোড় এলাকার কলাবাগান গলিতে বাবুল মিয়া বিল্ডিংয়ের ৫ম তলার ইশরাত জাহান মিমি নামের এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাড়িতে দুই শিশুও উপস্থিত ছিল। প্রাথমিক ভাবে জানা যায়, নিহত ইশরাত জাহান ও কাউসার আহমেদ স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই বাসায় ভাড়া থাকলেও তারা পরকীয়া সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন। এরপর নিহতের মা মুক্তা বেগম কাউসার আহমেদসহ অজ্ঞাত দুইজনের বিরুদ্ধে জামালপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটির তদন্ত শুরু করে পিবিআই।

তদন্তে জানা যায়, ২০১৪ সালে নিহত ইশরাত জাহান সঙ্গে শাওন নামের এক ব্যক্তির বিয়ে হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে একজন মেয়ে ও একজন ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। নিহতের স্বামী শাওন ২০২১ সালে মারা গেলে নিহত ইশরাত জাহান তার দুই সন্তানদের নিয়ে জামালপুর শহরে বসবাস করতে থাকে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রায় ৩ বছর আগে আসামি কাওসার আহমেদ শাওনের ‘রাফি স্টোর’ নামক মনোহারি দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে ইশরাতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন ইশরাত তার স্বামী কাতারে আছে বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়মিত আসামি কাউসার আহমেদের দোকানে গিয়ে নগদ ও বাকিতে কেনাকাটা করতেন। এক সময় ইশরাত দোকানের বকেয়া টাকা পরিশোধ করার জন্য আসামি কাউসারকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে যায়। কাউসার ইশরাতের বাসায় গেলে ইশরাত জানান, তার স্বামী কিছুদিন আগে মারা গেছে। ওই দিন কাউসার ও ইসরাত শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ইশরাত শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে গোপনে ভিডিও ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে ইশরাত আসামি কাউসারকে ধারাবাহিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের অর্থ আদায় করতে থাকে এবং উচ্চাভিলাষী জীবন যাপন শুরু করে। নিহত ইশরাত নিজেও ইয়াবা সেবন করতো, একই সঙ্গে তিনি আসামি কাউসারকে ইয়াবা সেবনে আসক্ত করে আসামির পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করতে থাকে। এভাবে আসামি কাওসার তার সঞ্চিত অর্থ শেষ করার পর সে জামালপুর শহরে বাড়ির জমি বিক্রিসহ মা ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রির অর্থ মিম্মির পেছনে ব্যয় করে। এছাড়া ইশরাত ব্ল্যাকমেইল করার জন্য বিভিন্ন লোকজনদেরকে টার্গেট করতো এবং আসামিকে সেই সব লোকজনদের ফাঁদে ফেলে বাসায় নিয়ে আসতে চাপ প্রয়োগ করতো। আসামি এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ইশরাত ও আসামির মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন ইশরাত কাউসারকে ফোন করে তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় এবং কাউসারের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করলে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ইশরাত কাউসারের স্ত্রীকে ফোন দিয়ে তাদের অবৈধ সর্ম্পকের কথা জানিয়ে দেয় এবং কাওসার তার সঙ্গে আছে বলে কাউসারের স্ত্রীকে কথা বলিয়ে দিতে গেলে কাউসারের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে কাউসার ইশরাত জাহানের গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর পিবিআই তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় কাউসার আহমেদ খানকে গতকার সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জামালপুর শহরের বাগেরহাটা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।

এই বিষয়ে পিবিআই জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, কাউসার আহমেদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে। আর নিহত নারীর বাচ্চা দুটি তার নানির বাড়িতে রয়েছে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

স্বামী-স্ত্রী নন, জামালপুরে গৃহবধূ হত্যার নেপথ্যে পরকীয়া ও ভিডিও ফাঁদ

প্রকাশের সময় : ০৬:২৩:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

গত ২৩ আগস্ট জামালপুরে ভাড়া বাসায় ‘দুই সন্তানকে আটকে রেখে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুনের’ ঘটনার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে জানা গেছে নিহত ইসরাত জাহান মিমি ও কাউসার আহমেদ শাওন সর্ম্পকে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না। বরং তাদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়া সম্পর্ক চলছিল।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে শহরের বাগেরহাটা এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পিবিআই জামালপুরে পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত।

পিবিআই জানায়, গত ২৩ আগস্ট শনিবার সকাল ১০টার দিকে জামালপুর শহরের পাঁচরাস্তা মোড় এলাকার কলাবাগান গলিতে বাবুল মিয়া বিল্ডিংয়ের ৫ম তলার ইশরাত জাহান মিমি নামের এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাড়িতে দুই শিশুও উপস্থিত ছিল। প্রাথমিক ভাবে জানা যায়, নিহত ইশরাত জাহান ও কাউসার আহমেদ স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই বাসায় ভাড়া থাকলেও তারা পরকীয়া সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন। এরপর নিহতের মা মুক্তা বেগম কাউসার আহমেদসহ অজ্ঞাত দুইজনের বিরুদ্ধে জামালপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটির তদন্ত শুরু করে পিবিআই।

তদন্তে জানা যায়, ২০১৪ সালে নিহত ইশরাত জাহান সঙ্গে শাওন নামের এক ব্যক্তির বিয়ে হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে একজন মেয়ে ও একজন ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। নিহতের স্বামী শাওন ২০২১ সালে মারা গেলে নিহত ইশরাত জাহান তার দুই সন্তানদের নিয়ে জামালপুর শহরে বসবাস করতে থাকে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রায় ৩ বছর আগে আসামি কাওসার আহমেদ শাওনের ‘রাফি স্টোর’ নামক মনোহারি দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে ইশরাতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন ইশরাত তার স্বামী কাতারে আছে বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়মিত আসামি কাউসার আহমেদের দোকানে গিয়ে নগদ ও বাকিতে কেনাকাটা করতেন। এক সময় ইশরাত দোকানের বকেয়া টাকা পরিশোধ করার জন্য আসামি কাউসারকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে যায়। কাউসার ইশরাতের বাসায় গেলে ইশরাত জানান, তার স্বামী কিছুদিন আগে মারা গেছে। ওই দিন কাউসার ও ইসরাত শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ইশরাত শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে গোপনে ভিডিও ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে ইশরাত আসামি কাউসারকে ধারাবাহিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের অর্থ আদায় করতে থাকে এবং উচ্চাভিলাষী জীবন যাপন শুরু করে। নিহত ইশরাত নিজেও ইয়াবা সেবন করতো, একই সঙ্গে তিনি আসামি কাউসারকে ইয়াবা সেবনে আসক্ত করে আসামির পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা করতে থাকে। এভাবে আসামি কাওসার তার সঞ্চিত অর্থ শেষ করার পর সে জামালপুর শহরে বাড়ির জমি বিক্রিসহ মা ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রির অর্থ মিম্মির পেছনে ব্যয় করে। এছাড়া ইশরাত ব্ল্যাকমেইল করার জন্য বিভিন্ন লোকজনদেরকে টার্গেট করতো এবং আসামিকে সেই সব লোকজনদের ফাঁদে ফেলে বাসায় নিয়ে আসতে চাপ প্রয়োগ করতো। আসামি এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ইশরাত ও আসামির মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন ইশরাত কাউসারকে ফোন করে তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় এবং কাউসারের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করলে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ইশরাত কাউসারের স্ত্রীকে ফোন দিয়ে তাদের অবৈধ সর্ম্পকের কথা জানিয়ে দেয় এবং কাওসার তার সঙ্গে আছে বলে কাউসারের স্ত্রীকে কথা বলিয়ে দিতে গেলে কাউসারের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে কাউসার ইশরাত জাহানের গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর পিবিআই তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় কাউসার আহমেদ খানকে গতকার সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জামালপুর শহরের বাগেরহাটা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।

এই বিষয়ে পিবিআই জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, কাউসার আহমেদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে। আর নিহত নারীর বাচ্চা দুটি তার নানির বাড়িতে রয়েছে।