পে-স্কেল : বেসরকারি চাকরিজীবীদের ভবিষ্যৎ কী?
- প্রকাশের সময় : ০১:০২:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
- / 26
বেসরকারি খাতে কোনো নির্দিষ্ট ‘জাতীয় পে স্কেল’ নেই, তাই সরকারি চাকরির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পে স্কেল শুরুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা ইতিহাস নেই। মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নীতি, কাজের ধরন, সক্ষমতা এবং বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল তৈরি ও বাস্তবায়ন করে থাকে।
বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যই সরকার নির্ধারিত জাতীয় বেতন স্কেল বা পে-স্কেল চালু রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই সর্বপ্রথম সরকারি কর্মচারীদের জন্য জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়।
এবার, দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হতে পারে– এই খবরে বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী?
সরকারি দফতরে আনন্দের হাওয়া, ঠিক তখনই দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এই মহোৎসবের বিপরীতে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ কী? নতুন পে-স্কেলের আলো কি কোনোভাবেই পৌঁছাবে বেসরকারি খাতে? নাকি তারা পাবেন শুধু নতুন করে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির?
বিভন্ন তথ্য অনুযায়ী, এবারের পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে সংশোধিত মূল বেতনের একটি অংশ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির আশা করা হলেও, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরে রাখা বেসরকারি খাতের কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে : শিল্প, তৈরি পোশাক, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও গণমাধ্যমসহ অর্থনীতির সব প্রধান চালিকাশক্তিই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের জন্য একটি খসড়া ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি–সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড, চাকরির নিরাপত্তা, উৎসব ভাতা ও সার্বিক শ্রমবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হলেও বেসরকারি খাতের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সুবিধার রূপরেখা এই মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রম নীতিমালা সংস্কারের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে।
পে-স্কেল: সচিব কমিটির সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হলো সরকারি পে-স্কেল সরাসরি বেসরকারি খাতের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে সরকারি বেতন বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে বেসরকারি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়।
গত পে-স্কেলগুলোতে সরকারি কাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি খাতে যে সুবিধাগুলো সাধারণত প্রসারিত হয়েছে:
মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: সরকারি কাঠামোতে মূল বেতন বাড়ার কারণে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং প্রারম্ভিক মূল বেতন সমন্বয় করতে বাধ্য হয়।
ভাতা সমন্বয়: সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও কর্মীদের জন্য এই ভাতাগুলো বাড়িয়ে থাকে।
বোনাস ও প্রণোদনা: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব বোনাস ও বিশেষ সুবিধার প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতেও।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক: সরকারি পে-স্কেলের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়।
শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও গ্র্যাচুইটি: নতুন পে-স্কেলে সরকারি পেনশনের হার ও গ্র্যাচুইটি বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং টার্মিনেশন বেনিফিট পাওয়ার ক্ষেত্রে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে পারেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী বাংলাদেশে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও কী সুবিধা বর্তমানে কার্যকর নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ সুবিধা বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেতে পারেন এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।






















