Dhaka ০৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
শৈলকুপায় তীব্র গরমে পাটক্ষেতে কৃষকের মৃত্যু ফেনী ও পঞ্চগড়ের সমালোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পাংশা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত ভোগান্তি কমাতে এবার তিন ধাপে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হবে: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ‌‘সুবর্ণা মোহন্ত’ থেকে ‘সুবর্ণা সেলিম’, এরপর ‘সুবর্ণা’ তারপর ‘বেওয়ারিশ লাশ’? মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুভেন্দুর পদত্যাগ করলেন ঢাবির সহকারী প্রক্টর শেহরীন মোনামি ট্রাইব্যুনালে ২২৭৬ নেতাকর্মীকে গুম-খুনের অভিযোগ বিএনপির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়ে ফের বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা

‌‘সুবর্ণা মোহন্ত’ থেকে ‘সুবর্ণা সেলিম’, এরপর ‘সুবর্ণা’ তারপর ‘বেওয়ারিশ লাশ’?

ফারজানা সিদ্দিকা রনি
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • / 105

ফেসবুকে সুবর্ণা দুবার তার নাম বদল করেছে। সর্বশেষ নামে তার কোনো পদবি নেই, কেবলই সুবর্ণা!

ভাবছিলাম কবর হয়ে যাবার পর সুবর্ণাকে নিয়ে লিখবো। বন্ধুরা, সিনিয়র-জুনিয়ররা তাদের টাইমলাইনে কতকিছু লিখছে! সবার লেখা পড়ছি মন দিয়ে। কেন যেন মনে হচ্ছে, সবাই ভুলে গেছে ওর জন্মনামটি! যে নাম ভুলেছে ওর জন্মদাতা বাবা-মাও! সুবর্ণাও ভুলতে চেয়েছে হয়তো… পেরেছিল কি! ঢাকা মেডিকেলের আইসিউতে অসহ্য কষ্টে একবারও কি মা বলে ডাকেনি সে!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ তম ব্যাচে ইংরেজি বিভাগে যে মেয়েটি ভর্তি হয়েছিল তার নাম ছিলো সুবর্ণা মোহন্ত। আমরা জাহানারা ইমাম হলে বি ব্লকে থাকতাম। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি, বিবিএ, নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই সেসময় নিজেরা জোট বেঁধে থাকতো। সুবর্ণা তেমন ছিলো না। শুরু থেকেই ওর বন্ধু সংখ্যা অগণন ছিলো। কিন্তু কেবল মিশুক বলে নয়, আরও একটা কারণে সেই ফার্স্ট ইয়ারেই আমাদের ব্যাচের সবাই সুবর্ণাকে চিনতো।

জাহানারা ইমাম হলের পাশেই “পারিজাত” নামে একটা নার্সারি ছিলো। প্রতিদিন হলে কারও না কারও জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমরা দল বেঁধে সে নার্সারিতে গোলাপ কিনতে যেতাম।বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি লিজ নিয়ে তৈরি সে নার্সারির মালিক ছিলেন সুদর্শন মৃদুভাষী সেলিম ভাই। তিনি জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র ছিলেন না, তার বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারে বাসা হবার কারণে ক্যাম্পাসে সেলিম ভাইয়ের বন্ধু অনেক। বাসা থেকে সেলিম ভাই নার্সারিতে আসতেন একটা ফনিক্স সাইকেল চালিয়ে। আমরা সেই ফার্স্ট ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে আবিস্কার করলাম, সুবর্ণা সেলিম ভাইয়ের সাইকেলের পেছনে সারা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায়। হল থেকে সবজি রান্না করে বক্সে নিয়ে চলে যায় পারিজাতে। দুজনে একসঙ্গে ভাত খায়।

ওদের বিভাগের শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক একদিন আমাকে আর প্রশান্তকে আফসোস করে বলেছিলেন, “সুবর্ণা বেশ মেধাবী ছাত্রী কিন্তু প্রেমটেম করে কি যে করবে মেয়েটা!”

সেই “সুবর্ণা মোহন্ত” সেলিম ভাইকে বিয়ে করে হলো “সুবর্ণা সেলিম”। ওর বাবা-মা ও বোনেরা ওর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিলেন। কোনোদিন আর সুবর্ণা তাদের সংস্পর্শ পায়নি। যখন ওর চার বছর বয়েসী পুত্র অরণ্য ব্রেইন টিউমরে মারা যায় তখনও সেই দুঃসহ শোকের দিনে সুবর্ণার বাবার বাড়ির কেউ ওর মাথায় একটু হাত রাখেনি। ২০২১ এর ডিসেম্বর থেকে ওর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নানাভাবে ওনাদের কাছে খবর দেয়া হয়েছে… সাফ জবাব এসেছে, সুবর্ণা নামে কাউকে চেনেন না তারা!
মানবিকতাকে ঝেঁটিয়ে ধর্মকে এমনভাবেই রক্ষা করেছেন সুবর্ণার পরিবার…!

সেলিম ভাই আর সুবর্ণার সংসারে এসেছিল অরণ্য। চার বছর বয়সে ব্রেইন টিউমর ধরা পড়লো ছেলেটার। বিপুল অঙ্কের টাকা দরকার। মনে পড়ে, সে সময় বন্ধুরা টাকা কালেকশনে নেমেছিল। ওর শিক্ষক মোহাম্মদ রফিক মানবিক আবেদন জানিয়ে পত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন। সিঙ্গাপুরে নেয়া হলো চিকিৎসার জন্য। কিন্তু বাঁচানো গেলো না অরণ্যকে!

জাপান গার্ডেন সিটিতে তখন থাকতো ওরা। আমি একদিন গিয়েছিলাম অরণ্যকে দেখতে। তখন অরণ্যর পুরো শরীর বেঁকে গেছে, কথা বন্ধ। সেদিন সেলিম ভাই আর সুবর্ণার মুখে যে অসহায়ত্ব দেখেছি, তা এ জীবনে ভুলবো না।

২০০৯-এ অরণ্যকে হারিয়ে সুবর্ণা কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। একের পর এক পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষকতা করে চলছিল। নানান ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে সেলিম ভাই তখন চূড়ান্তভাবে ঘরমুখো। পুত্র হারানোর শোক তার পার্থিব টান শিথিল করে দিচ্ছিল।

সম্পর্কের নানান টানাপোড়েনে ২০২০ সালে সুবর্ণা আর সেলিম ভাইয়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
বিয়ের পরে “সুবর্ণা মোহন্তে”র প্রথম রূপান্তর হয়েছিল “সুবর্ণা সেলিম”, তারপর বিবাহ বিচ্ছেদের পর কেবল “সুবর্ণা” হয়ে যায়!

কেউ যদি ফেসবুকে সুবর্ণার ২০২১ সালটা লক্ষ করে দেখা যাবে, সারাটা বছর সে কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে! কখনও সিলেটে, কখনও কক্সবাজারে, কখনও নিকলীতে, কখনও জল জঙ্গলে। যুক্ত হয়েছিল জাবি টুরিস্ট ক্লাবের সঙ্গে। সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলো বন্ধু মণি আর সাজ্জাদ। কখনও কাঁকন, রিবন, মুনা। আর যেখানেই গেছে, বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে যেত। যেন, অরণ্যকে খুঁজতো সে সকলের মধ্যে! প্রায়ই এতিমখানায় খাবার দিতো। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ১২ ডিসেম্বর সুবর্ণার জন্মদিনটাই অরণ্যের মৃত্যুরও দিন!
২০২১ সালের সেই ১২ ডিসেম্বরেই সুবর্ণা প্রথম স্ট্রোক করে! জন্ম ও মৃত্যুর দাগ লেগে থাকা সেই দিন! সেসময় ওর এক হাত ও এক পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। বন্ধু সাজ্জাদ-মণি-মুনা রীতিমতো টিমওয়ার্ক করে ওকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে টাকা যোগাড়… সবকিছু সমন্বয় করে। ইংরেজি বিভাগের বন্ধুরাসহ পুরো ব্যাচ সুবর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। দেশবিদেশে থাকা বন্ধু-সিনিয়র-জুনিয়ররা সাহায্যের হাত বাড়ায়। বিশেষ করে, বন্ধু মণি সুবর্ণার জন্য গত সাড়ে চার বছর ধরে যে দায়িত্ব পালন করেছে তা এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বিরল! মণির বড়ো বোন আলেয়া আপার তত্ত্বাবধানে ছিলো সুবর্ণা। আলেয়া আপা ওকে আগলে রেখেছিলেন।

আর হ্যা, গত সাড়ে চার বছর ধরে সুবর্ণার যাবতীয় খরচ যোগাতে নিভৃতে কয়েকজন বন্ধু পাশে ছিলো। সুবর্ণার চিকিৎসা ও অন্যান্য অনেক খরচের ক্ষেত্রে একজন জুনিয়র বন্ধুর অবদানও কোনোদিন ভুলবার নয়।

মাস ছয়েক আগে, একদিন মণি ফোন করে জানালো, পারিবারিক সমস্যার জন্য আলেয়া আপাকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। সুবর্ণাকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। অনেক ভেবেচিন্তে আমি পুরো পরিস্থিতি বর্ণনা করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। সেই স্ট্যাটাসের সারমর্ম ছিল এমন…, “৫১ বছর বয়েসী, শিক্ষিত, অর্ধ প্যারালাইজড একজন রুগীর যাবতীয় খরচ প্রদান করা হবে, কেবল তার থাকার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় দরকার।” স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে অনেকে নানান বৃদ্ধাশ্রমের লিংক, ফোন নাম্বার দিতে থাকলেন। সবখানেই যোগাযোগ করলাম, ফলাফল? সবাই চরম অসহায় ৬৫+ বৃদ্ধাকে আশ্রয় দেবেন, সুবর্ণার মতো শিক্ষিত, অর্ধ প্যারালাইজড, স্বচ্ছল কোনো মানুষকে নন। অনেক চেষ্টার পরেও এদেশে সুবর্ণার মতো কোনো মানুষের জন্য একটা উপযুক্ত আশ্রয় পাওয়া গেল না তখন।

এর কিছুদিন পরে, সিডনি প্রবাসী বন্ধু হেনা আমাকে ফোন করে প্রস্তাব দিলো, টাঙ্গাইলে ওর বাবার বাড়িতে সুবর্ণাকে রাখবার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। কিভাবে কি ব্যবস্থা হবে তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললাম আমি, হেনা আর মণি। ঠিক হলো, এই মে মাসের ২০ তারিখে আমি আর মণি সুবর্ণাকে টাঙ্গাইলে রেখে আসবো। হেনার বড়ো ভাই, বোন সবাই আশেপাশে থাকেন। একজন সার্বক্ষণিক সহকারীও পাওয়া যাবে। সুবর্ণাকে জানানো হলো, সে নিমরাজি! ঢাকার বাইরে, বন্ধুবৃত্তের বাইরে, আলেয়া আপার সাহচর্য ছাড়া, সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় যেতে চায় না সে। সপ্তাহ তিনেক আগে, আমাকে ফোন করে ধমকের সুরে বললো, ” তোরা আমারে নাকি ঢাকায় রাখবি না?”

আমি সব পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম, মনে হলো, মনে মনে মানতে পারছে না সে।
দ্বিতীয় দফায় স্ট্রোক করলো সুবর্ণা! প্রথমদিনই মণি জানালো, পরিস্থিতি ভালো নয়! বন্ধুরা দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেল। বন্ধু বিদ্যুৎ আর কাজলের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব ছিল এ কাজ। কিন্তু কে থাকবে হাসপাতালে জেনারেল ওয়ার্ডে ওর সঙ্গে? মণির বোন আলেয়া আপার পক্ষে বয়সজনিত কারণে হাসপাতালে থাকা সম্ভব নয়। বন্ধুরা সবাই চাকরিবাকরি করে। আর সেই ঢাকা শহরের আরেক মাথায় ঢাকা মেডিকেল ও তার জেনারেল ওয়ার্ড… পরিবেশ সম্পর্কে কমবেশি সবারই ধারণা আছে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে বন্ধু মুনা। একজন কেয়ারগিভার ঠিক করে দিলো মুনা। রুবিনা নামের মেয়েটি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলো।
তারপর আইসিউ, রক্ত দেয়া, ডায়ালোসিস… প্রতিটা দিন পাথরের মতো ভারী আর রুক্ষ!
আবারও চিকিৎসার খরচ যোগান দিলো বন্ধুরা।
তারপর ৯মে বিকেলে সুবর্ণা চলে গেল!
এত কি সহজ ওর চলে যাওয়া!!
ও যে “সুবর্ণা মোহন্ত” থেকে “সুবর্ণা সেলিম” হয়ে কেবল সুবর্ণা!!

মেডিকেল কতৃপক্ষ নিয়ম মেনে জানালেন, নিকটাত্মীয় ছাড়া “লাশ”-এর ছাড়পত্র হবে না। কাউকে পাওয়া না গেলে “বেওয়ারিশ লাশ” হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করবে কতৃপক্ষ। এদেশে কে সুবর্ণার “নিকটাত্মীয়”? সাড়ে চার বছর ধরে দেখভাল করা আলেয়া আপা নন, মণি-মুনা-সাজ্জাদ নয়, অর্থের যোগান দেয়া বন্ধুরা নয়, ক্লাসমেটরা নয়… কে তবে?? সেলিম ভাইকে বিয়ে করার অপরাধে বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে সেই কবে থেকে মৃত সে! সেলিম ভাইয়ের সঙ্গেও বিচ্ছেদ… আর কোন নিকটাত্মীয় ছিল ওর??

“সুবর্ণা মোহন্ত” থেকে “সুবর্ণা সেলিম” থেকে “সুবর্ণা” থেকে “বেওয়ারিশ লাশ”… এদেশে এইই হবে ওর পরিচয় ??

বন্ধুদের অনুরোধে এগিয়ে এলেন সুবর্ণার জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষ সেলিম ভাই। ছোটবোন বুশরাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসে সুবর্ণাকে “বেওয়ারিশ” হবার যন্ত্রণা থেকে বাঁচালেন! মনে হলো, সেই পারিজাত নার্সারি থেকে একগুচ্ছ গোলাপ হাতে এলেন সেলিম ভাই!

সুবর্ণার প্রিয়তম আশ্রয়ভূমি জাহাঙ্গীরনগর লাগোয়া রাঙামাটি গ্রামের কবরস্থানে ঠাঁই হলো ওর। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই কবরস্থানে শুয়ে আছে ওর ছেলে অরণ্য!
মা দিবসে মাতাপুত্রের মিলন হলো যেন!

লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
(লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

‌‘সুবর্ণা মোহন্ত’ থেকে ‘সুবর্ণা সেলিম’, এরপর ‘সুবর্ণা’ তারপর ‘বেওয়ারিশ লাশ’?

প্রকাশের সময় : ০৬:৪০:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ফেসবুকে সুবর্ণা দুবার তার নাম বদল করেছে। সর্বশেষ নামে তার কোনো পদবি নেই, কেবলই সুবর্ণা!

ভাবছিলাম কবর হয়ে যাবার পর সুবর্ণাকে নিয়ে লিখবো। বন্ধুরা, সিনিয়র-জুনিয়ররা তাদের টাইমলাইনে কতকিছু লিখছে! সবার লেখা পড়ছি মন দিয়ে। কেন যেন মনে হচ্ছে, সবাই ভুলে গেছে ওর জন্মনামটি! যে নাম ভুলেছে ওর জন্মদাতা বাবা-মাও! সুবর্ণাও ভুলতে চেয়েছে হয়তো… পেরেছিল কি! ঢাকা মেডিকেলের আইসিউতে অসহ্য কষ্টে একবারও কি মা বলে ডাকেনি সে!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ তম ব্যাচে ইংরেজি বিভাগে যে মেয়েটি ভর্তি হয়েছিল তার নাম ছিলো সুবর্ণা মোহন্ত। আমরা জাহানারা ইমাম হলে বি ব্লকে থাকতাম। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি, বিবিএ, নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই সেসময় নিজেরা জোট বেঁধে থাকতো। সুবর্ণা তেমন ছিলো না। শুরু থেকেই ওর বন্ধু সংখ্যা অগণন ছিলো। কিন্তু কেবল মিশুক বলে নয়, আরও একটা কারণে সেই ফার্স্ট ইয়ারেই আমাদের ব্যাচের সবাই সুবর্ণাকে চিনতো।

জাহানারা ইমাম হলের পাশেই “পারিজাত” নামে একটা নার্সারি ছিলো। প্রতিদিন হলে কারও না কারও জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমরা দল বেঁধে সে নার্সারিতে গোলাপ কিনতে যেতাম।বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি লিজ নিয়ে তৈরি সে নার্সারির মালিক ছিলেন সুদর্শন মৃদুভাষী সেলিম ভাই। তিনি জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র ছিলেন না, তার বাবা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়াটারে বাসা হবার কারণে ক্যাম্পাসে সেলিম ভাইয়ের বন্ধু অনেক। বাসা থেকে সেলিম ভাই নার্সারিতে আসতেন একটা ফনিক্স সাইকেল চালিয়ে। আমরা সেই ফার্স্ট ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে আবিস্কার করলাম, সুবর্ণা সেলিম ভাইয়ের সাইকেলের পেছনে সারা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায়। হল থেকে সবজি রান্না করে বক্সে নিয়ে চলে যায় পারিজাতে। দুজনে একসঙ্গে ভাত খায়।

ওদের বিভাগের শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক একদিন আমাকে আর প্রশান্তকে আফসোস করে বলেছিলেন, “সুবর্ণা বেশ মেধাবী ছাত্রী কিন্তু প্রেমটেম করে কি যে করবে মেয়েটা!”

সেই “সুবর্ণা মোহন্ত” সেলিম ভাইকে বিয়ে করে হলো “সুবর্ণা সেলিম”। ওর বাবা-মা ও বোনেরা ওর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিলেন। কোনোদিন আর সুবর্ণা তাদের সংস্পর্শ পায়নি। যখন ওর চার বছর বয়েসী পুত্র অরণ্য ব্রেইন টিউমরে মারা যায় তখনও সেই দুঃসহ শোকের দিনে সুবর্ণার বাবার বাড়ির কেউ ওর মাথায় একটু হাত রাখেনি। ২০২১ এর ডিসেম্বর থেকে ওর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নানাভাবে ওনাদের কাছে খবর দেয়া হয়েছে… সাফ জবাব এসেছে, সুবর্ণা নামে কাউকে চেনেন না তারা!
মানবিকতাকে ঝেঁটিয়ে ধর্মকে এমনভাবেই রক্ষা করেছেন সুবর্ণার পরিবার…!

সেলিম ভাই আর সুবর্ণার সংসারে এসেছিল অরণ্য। চার বছর বয়সে ব্রেইন টিউমর ধরা পড়লো ছেলেটার। বিপুল অঙ্কের টাকা দরকার। মনে পড়ে, সে সময় বন্ধুরা টাকা কালেকশনে নেমেছিল। ওর শিক্ষক মোহাম্মদ রফিক মানবিক আবেদন জানিয়ে পত্রিকায় কলাম লিখেছিলেন। সিঙ্গাপুরে নেয়া হলো চিকিৎসার জন্য। কিন্তু বাঁচানো গেলো না অরণ্যকে!

জাপান গার্ডেন সিটিতে তখন থাকতো ওরা। আমি একদিন গিয়েছিলাম অরণ্যকে দেখতে। তখন অরণ্যর পুরো শরীর বেঁকে গেছে, কথা বন্ধ। সেদিন সেলিম ভাই আর সুবর্ণার মুখে যে অসহায়ত্ব দেখেছি, তা এ জীবনে ভুলবো না।

২০০৯-এ অরণ্যকে হারিয়ে সুবর্ণা কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। একের পর এক পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষকতা করে চলছিল। নানান ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে সেলিম ভাই তখন চূড়ান্তভাবে ঘরমুখো। পুত্র হারানোর শোক তার পার্থিব টান শিথিল করে দিচ্ছিল।

সম্পর্কের নানান টানাপোড়েনে ২০২০ সালে সুবর্ণা আর সেলিম ভাইয়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
বিয়ের পরে “সুবর্ণা মোহন্তে”র প্রথম রূপান্তর হয়েছিল “সুবর্ণা সেলিম”, তারপর বিবাহ বিচ্ছেদের পর কেবল “সুবর্ণা” হয়ে যায়!

কেউ যদি ফেসবুকে সুবর্ণার ২০২১ সালটা লক্ষ করে দেখা যাবে, সারাটা বছর সে কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে! কখনও সিলেটে, কখনও কক্সবাজারে, কখনও নিকলীতে, কখনও জল জঙ্গলে। যুক্ত হয়েছিল জাবি টুরিস্ট ক্লাবের সঙ্গে। সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলো বন্ধু মণি আর সাজ্জাদ। কখনও কাঁকন, রিবন, মুনা। আর যেখানেই গেছে, বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে যেত। যেন, অরণ্যকে খুঁজতো সে সকলের মধ্যে! প্রায়ই এতিমখানায় খাবার দিতো। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ১২ ডিসেম্বর সুবর্ণার জন্মদিনটাই অরণ্যের মৃত্যুরও দিন!
২০২১ সালের সেই ১২ ডিসেম্বরেই সুবর্ণা প্রথম স্ট্রোক করে! জন্ম ও মৃত্যুর দাগ লেগে থাকা সেই দিন! সেসময় ওর এক হাত ও এক পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। বন্ধু সাজ্জাদ-মণি-মুনা রীতিমতো টিমওয়ার্ক করে ওকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে টাকা যোগাড়… সবকিছু সমন্বয় করে। ইংরেজি বিভাগের বন্ধুরাসহ পুরো ব্যাচ সুবর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। দেশবিদেশে থাকা বন্ধু-সিনিয়র-জুনিয়ররা সাহায্যের হাত বাড়ায়। বিশেষ করে, বন্ধু মণি সুবর্ণার জন্য গত সাড়ে চার বছর ধরে যে দায়িত্ব পালন করেছে তা এ নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বিরল! মণির বড়ো বোন আলেয়া আপার তত্ত্বাবধানে ছিলো সুবর্ণা। আলেয়া আপা ওকে আগলে রেখেছিলেন।

আর হ্যা, গত সাড়ে চার বছর ধরে সুবর্ণার যাবতীয় খরচ যোগাতে নিভৃতে কয়েকজন বন্ধু পাশে ছিলো। সুবর্ণার চিকিৎসা ও অন্যান্য অনেক খরচের ক্ষেত্রে একজন জুনিয়র বন্ধুর অবদানও কোনোদিন ভুলবার নয়।

মাস ছয়েক আগে, একদিন মণি ফোন করে জানালো, পারিবারিক সমস্যার জন্য আলেয়া আপাকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। সুবর্ণাকে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। অনেক ভেবেচিন্তে আমি পুরো পরিস্থিতি বর্ণনা করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। সেই স্ট্যাটাসের সারমর্ম ছিল এমন…, “৫১ বছর বয়েসী, শিক্ষিত, অর্ধ প্যারালাইজড একজন রুগীর যাবতীয় খরচ প্রদান করা হবে, কেবল তার থাকার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় দরকার।” স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে অনেকে নানান বৃদ্ধাশ্রমের লিংক, ফোন নাম্বার দিতে থাকলেন। সবখানেই যোগাযোগ করলাম, ফলাফল? সবাই চরম অসহায় ৬৫+ বৃদ্ধাকে আশ্রয় দেবেন, সুবর্ণার মতো শিক্ষিত, অর্ধ প্যারালাইজড, স্বচ্ছল কোনো মানুষকে নন। অনেক চেষ্টার পরেও এদেশে সুবর্ণার মতো কোনো মানুষের জন্য একটা উপযুক্ত আশ্রয় পাওয়া গেল না তখন।

এর কিছুদিন পরে, সিডনি প্রবাসী বন্ধু হেনা আমাকে ফোন করে প্রস্তাব দিলো, টাঙ্গাইলে ওর বাবার বাড়িতে সুবর্ণাকে রাখবার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। কিভাবে কি ব্যবস্থা হবে তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বললাম আমি, হেনা আর মণি। ঠিক হলো, এই মে মাসের ২০ তারিখে আমি আর মণি সুবর্ণাকে টাঙ্গাইলে রেখে আসবো। হেনার বড়ো ভাই, বোন সবাই আশেপাশে থাকেন। একজন সার্বক্ষণিক সহকারীও পাওয়া যাবে। সুবর্ণাকে জানানো হলো, সে নিমরাজি! ঢাকার বাইরে, বন্ধুবৃত্তের বাইরে, আলেয়া আপার সাহচর্য ছাড়া, সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় যেতে চায় না সে। সপ্তাহ তিনেক আগে, আমাকে ফোন করে ধমকের সুরে বললো, ” তোরা আমারে নাকি ঢাকায় রাখবি না?”

আমি সব পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম, মনে হলো, মনে মনে মানতে পারছে না সে।
দ্বিতীয় দফায় স্ট্রোক করলো সুবর্ণা! প্রথমদিনই মণি জানালো, পরিস্থিতি ভালো নয়! বন্ধুরা দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেল। বন্ধু বিদ্যুৎ আর কাজলের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব ছিল এ কাজ। কিন্তু কে থাকবে হাসপাতালে জেনারেল ওয়ার্ডে ওর সঙ্গে? মণির বোন আলেয়া আপার পক্ষে বয়সজনিত কারণে হাসপাতালে থাকা সম্ভব নয়। বন্ধুরা সবাই চাকরিবাকরি করে। আর সেই ঢাকা শহরের আরেক মাথায় ঢাকা মেডিকেল ও তার জেনারেল ওয়ার্ড… পরিবেশ সম্পর্কে কমবেশি সবারই ধারণা আছে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে বন্ধু মুনা। একজন কেয়ারগিভার ঠিক করে দিলো মুনা। রুবিনা নামের মেয়েটি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলো।
তারপর আইসিউ, রক্ত দেয়া, ডায়ালোসিস… প্রতিটা দিন পাথরের মতো ভারী আর রুক্ষ!
আবারও চিকিৎসার খরচ যোগান দিলো বন্ধুরা।
তারপর ৯মে বিকেলে সুবর্ণা চলে গেল!
এত কি সহজ ওর চলে যাওয়া!!
ও যে “সুবর্ণা মোহন্ত” থেকে “সুবর্ণা সেলিম” হয়ে কেবল সুবর্ণা!!

মেডিকেল কতৃপক্ষ নিয়ম মেনে জানালেন, নিকটাত্মীয় ছাড়া “লাশ”-এর ছাড়পত্র হবে না। কাউকে পাওয়া না গেলে “বেওয়ারিশ লাশ” হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করবে কতৃপক্ষ। এদেশে কে সুবর্ণার “নিকটাত্মীয়”? সাড়ে চার বছর ধরে দেখভাল করা আলেয়া আপা নন, মণি-মুনা-সাজ্জাদ নয়, অর্থের যোগান দেয়া বন্ধুরা নয়, ক্লাসমেটরা নয়… কে তবে?? সেলিম ভাইকে বিয়ে করার অপরাধে বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে সেই কবে থেকে মৃত সে! সেলিম ভাইয়ের সঙ্গেও বিচ্ছেদ… আর কোন নিকটাত্মীয় ছিল ওর??

“সুবর্ণা মোহন্ত” থেকে “সুবর্ণা সেলিম” থেকে “সুবর্ণা” থেকে “বেওয়ারিশ লাশ”… এদেশে এইই হবে ওর পরিচয় ??

বন্ধুদের অনুরোধে এগিয়ে এলেন সুবর্ণার জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষ সেলিম ভাই। ছোটবোন বুশরাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসে সুবর্ণাকে “বেওয়ারিশ” হবার যন্ত্রণা থেকে বাঁচালেন! মনে হলো, সেই পারিজাত নার্সারি থেকে একগুচ্ছ গোলাপ হাতে এলেন সেলিম ভাই!

সুবর্ণার প্রিয়তম আশ্রয়ভূমি জাহাঙ্গীরনগর লাগোয়া রাঙামাটি গ্রামের কবরস্থানে ঠাঁই হলো ওর। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই কবরস্থানে শুয়ে আছে ওর ছেলে অরণ্য!
মা দিবসে মাতাপুত্রের মিলন হলো যেন!

লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
(লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)