বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হবে? ৬৬ বছর আগের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সত্য? নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৯০০ কোটি টাকার তহবিল করবে বাংলাদেশ ব্যাংক: গভর্নর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার শঙ্কা, জরুরি সতর্কতা জারি জাবির সিএলসি ইনস্টিটিউটে পরিচালক নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক, নেপথ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বের অভিযোগ বাতাসে ঘুরবে গাড়ি, বাজারে আনছে ইলন মাস্কের টেসলা ১ লাখ টাকার মধ্যে সেরা ৫ ল্যাপটপ এশিয়া কাপ আর্চারি: ইরাকে বন্যা-শ্রীপর্ণা-মনির সোনা জয় ভারতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলো রিলসভিত্তিক ফেসবুক নিউজফিড ব্রাজিলিয়ান কুনিয়ার জোড়া গোলে অবিশ্বাস্য জয় ম্যানইউর রেকর্ড সৃষ্টি করে ৪৯২ কোটি টাকায় বিক্রি হলো ফেরারির ইলেকট্রিক গাড়ি ‘লুচে’

আমির, আসিফ, বাট: তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের পতন ও এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের ১৫ বছর

স্পোর্টস ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ১২:৪০:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / 13
আমির, আসিফ, বাট: তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের পতন ও এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের ১৫ বছর

পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। বোলার দৌড়ে এসে বল করেন। পা বোলিং ক্রিজে দাগের ওপাশে চলে গেলে আশপাশের সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘নো বল!’ ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। ক্রিকেটের সবচেয়ে সহজ নিয়ম এটাই। দাগের ওপারে পা পড়লে ‘নো’।নো বল মানে বাড়তি একটি রান। সঙ্গে একটি অতিরিক্ত বল। কখনো কখনো সেই নো বলের জন্য ব্যাটসম্যানকে আবার নতুন করে জীবনও দিতে হয়। বোলারের জন্য সেটি ভুল, আম্পায়ারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। আর দর্শকদের কাছে সামান্য বিরক্তির কারণ। তবে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসে এমন তিনটি নো বল হয়েছিল, যেগুলো আর দশটা নো বলের মতো ছিল না। সেগুলো ছিল সাজানো। আগে থেকেই ঠিক করা। ক্রিকেটের মাঠে দাঁড়িয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে গোপন চুক্তির বাস্তবায়ন।

খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত

সেই নো বলের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের তিন ক্রিকেটারকে। অধিনায়ক সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমির। তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই কেলেঙ্কারির চারজন আসামির সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর। আজ সেই ঘটনার ১৫ বছর পূর্তিতে ফিরে দেখা যাক ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন?

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য মাঠে নয়। লন্ডনের এক গোপন বৈঠকে। ২০১০ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সাংবাদিকেরা এক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যোগাযোগ করেন পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। মাজিদ তাঁদের আশ্বাস দেন, পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারকে দিয়ে ম্যাচের নির্দিষ্ট মুহূর্তে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটানো সম্ভব। সাংবাদিকেরা গোপনে ক্যামেরা চালু রেখেছিলেন।

মাজিদ তাঁদের সামনে টাকার বান্ডিল গুনলেন। জানালেন, লর্ডস টেস্টে মোহাম্মদ আমির ও মোহাম্মদ আসিফ কখন নো বল করবেন, সেটিও ঠিক করা আছে। বিনিময়ে জুয়াড়িরা আগে থেকেই বাজি ধরতে পারবে। ম্যাচে ফলাফল ঠিক করার দরকার নেই। একটি নির্দিষ্ট বল কখন নো হবে, সেটি জানাই যথেষ্ট। ক্রিকেটের ভাষায় যার নাম স্পট ফিক্সিং।২০১০ সালের ২৬ আগস্ট। লর্ডসে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের চতুর্থ টেস্ট। মাজিদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটি নো বল করবেন আমির। হলোও তা-ই। আমিরের পা বেরিয়ে গেল বোলিং ক্রিজের সীমারেখার বাইরে।

ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

ধারাভাষ্যকারের চোখেও সেটি অস্বাভাবিক। পা প্রায় আধা মিটার দূরে ছিল পপিং ক্রিজ থেকে। এরপর দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে নো বল করলেন আসিফ।দুটি বল। দুটি পূর্বাভাস। দুটি বাস্তবায়ন। মাঠের দর্শকেরা তখনো জানতেন না, এই বলগুলোর পেছনে কত বড় চিত্রনাট্য। জানতেন না, ক্রিকেটের সবচেয়ে পবিত্র বলে বিবেচিত লর্ডসের মাঠেই রচিত হচ্ছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়!

নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড গোপন ভিডিও প্রকাশ করার পর বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় শুরু হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড গ্রেপ্তার করে মাজহার মাজিদকে। তদন্তের আওতায় আসেন তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটার। তাঁদের মুঠোফোনও জব্দ করে পুলিশ।শুরুতে পাকিস্তান দলের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বীকার। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) তৎকালীন সভাপতি ইজাজ বাট বলেছিলেন, খেলোয়াড়েরা নির্দোষ। যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনার ওয়াজিদ শামসুল হাসান দাবি করেছিলেন, তাঁদের ‘ফাঁদে ফেলা’ হয়েছে। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে। তিন ক্রিকেটারও নিজেদের নির্দোষ বলে এসেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে।

তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে আইসিসি। এরপর শুরু হয় আইসিসির তদন্ত ও শুনানি। ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন আইসিসির স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল। সালমান বাটকে ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচ বছর স্থগিত সাজা। আসিফকে সাত বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার দুই বছর স্থগিত। আমিরের নিষেধাজ্ঞা পাঁচ বছর।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

আমির, আসিফ, বাট: তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটারের পতন ও এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের ১৫ বছর

প্রকাশের সময় : ১২:৪০:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। বোলার দৌড়ে এসে বল করেন। পা বোলিং ক্রিজে দাগের ওপাশে চলে গেলে আশপাশের সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘নো বল!’ ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। ক্রিকেটের সবচেয়ে সহজ নিয়ম এটাই। দাগের ওপারে পা পড়লে ‘নো’।নো বল মানে বাড়তি একটি রান। সঙ্গে একটি অতিরিক্ত বল। কখনো কখনো সেই নো বলের জন্য ব্যাটসম্যানকে আবার নতুন করে জীবনও দিতে হয়। বোলারের জন্য সেটি ভুল, আম্পায়ারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। আর দর্শকদের কাছে সামান্য বিরক্তির কারণ। তবে ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসে এমন তিনটি নো বল হয়েছিল, যেগুলো আর দশটা নো বলের মতো ছিল না। সেগুলো ছিল সাজানো। আগে থেকেই ঠিক করা। ক্রিকেটের মাঠে দাঁড়িয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে গোপন চুক্তির বাস্তবায়ন।

খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত

সেই নো বলের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছিল পাকিস্তানের তিন ক্রিকেটারকে। অধিনায়ক সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমির। তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই কেলেঙ্কারির চারজন আসামির সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর। আজ সেই ঘটনার ১৫ বছর পূর্তিতে ফিরে দেখা যাক ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন?

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য মাঠে নয়। লন্ডনের এক গোপন বৈঠকে। ২০১০ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের সাংবাদিকেরা এক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যোগাযোগ করেন পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। মাজিদ তাঁদের আশ্বাস দেন, পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারকে দিয়ে ম্যাচের নির্দিষ্ট মুহূর্তে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটানো সম্ভব। সাংবাদিকেরা গোপনে ক্যামেরা চালু রেখেছিলেন।

মাজিদ তাঁদের সামনে টাকার বান্ডিল গুনলেন। জানালেন, লর্ডস টেস্টে মোহাম্মদ আমির ও মোহাম্মদ আসিফ কখন নো বল করবেন, সেটিও ঠিক করা আছে। বিনিময়ে জুয়াড়িরা আগে থেকেই বাজি ধরতে পারবে। ম্যাচে ফলাফল ঠিক করার দরকার নেই। একটি নির্দিষ্ট বল কখন নো হবে, সেটি জানাই যথেষ্ট। ক্রিকেটের ভাষায় যার নাম স্পট ফিক্সিং।২০১০ সালের ২৬ আগস্ট। লর্ডসে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের চতুর্থ টেস্ট। মাজিদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটি নো বল করবেন আমির। হলোও তা-ই। আমিরের পা বেরিয়ে গেল বোলিং ক্রিজের সীমারেখার বাইরে।

ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

ধারাভাষ্যকারের চোখেও সেটি অস্বাভাবিক। পা প্রায় আধা মিটার দূরে ছিল পপিং ক্রিজ থেকে। এরপর দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে নো বল করলেন আসিফ।দুটি বল। দুটি পূর্বাভাস। দুটি বাস্তবায়ন। মাঠের দর্শকেরা তখনো জানতেন না, এই বলগুলোর পেছনে কত বড় চিত্রনাট্য। জানতেন না, ক্রিকেটের সবচেয়ে পবিত্র বলে বিবেচিত লর্ডসের মাঠেই রচিত হচ্ছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়!

নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড গোপন ভিডিও প্রকাশ করার পর বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় শুরু হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড গ্রেপ্তার করে মাজহার মাজিদকে। তদন্তের আওতায় আসেন তিন পাকিস্তানি ক্রিকেটার। তাঁদের মুঠোফোনও জব্দ করে পুলিশ।শুরুতে পাকিস্তান দলের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বীকার। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) তৎকালীন সভাপতি ইজাজ বাট বলেছিলেন, খেলোয়াড়েরা নির্দোষ। যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনার ওয়াজিদ শামসুল হাসান দাবি করেছিলেন, তাঁদের ‘ফাঁদে ফেলা’ হয়েছে। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে। তিন ক্রিকেটারও নিজেদের নির্দোষ বলে এসেছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে।

তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে আইসিসি। এরপর শুরু হয় আইসিসির তদন্ত ও শুনানি। ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন আইসিসির স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল। সালমান বাটকে ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচ বছর স্থগিত সাজা। আসিফকে সাত বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার দুই বছর স্থগিত। আমিরের নিষেধাজ্ঞা পাঁচ বছর।