বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
নওগাঁয় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গসহ আটক ১ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে: হান্নান মাসউদ ১০ জানুয়ারি শুরু জাবির ভর্তি পরীক্ষা, চলবে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত গণভোটের রায় অমান্য করলে সরকারকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে: মঞ্জু ‘দার-ই-নিজাত’-এর আবু বকর কেন নেটিজেনদের জাতীয় ক্রাশ? স্থানীয় সরকার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো দেখছি না: নাহিদ ইসলাম যায়নবাদ: মানব অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি স্পেনে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ মিরপুর টেস্টের প্রথম দিন শেষে স্বস্তিতে টাইগাররা ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, চারশ ছাড়াল প্রাণহানি

যায়নবাদ: মানব অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি

আব্দুস সোবাহান
  • প্রকাশের সময় : ০৬:০২:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 9

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের পরোক্ষ প্রভাবে উদ্ভূত রাজনৈতিক যায়নবাদ (Zionism) মূলত ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ভূমিতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি ও মানবাধিকারের বাস্তবতায় এই দর্শনের সামরিক ও চরমপন্থি প্রয়োগ কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভূখণ্ডগত দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্টের (Hannah Arendt) সতর্কবার্তার কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে যখন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ অন্যায়কে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতায় রূপ দেয়, তখন তা মানবীয় চেতনার মূলে আঘাত হানে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দর্শনের চরমপন্থি অনুশীলন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা, সর্বজনীন মানবিক মর্যাদা এবং শাশ্বত বিশ্বশান্তির ভিত্তিকে ক্ষয়িষ্ণু করে এক গভীর সর্বজনীন সংকটে রূপ নিয়েছে।

​প্রখ্যাত চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদের (Edward Said), ‘অরিয়েন্টালিজম’ (Orientalism) তত্ত্বের আলোকেও এই সংকটের মূল শিকড় অনুধাবন করা সম্ভব। সেখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোয় অনুন্নত বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিতভাবে অবমূল্যায়ন করে তাদের ওপর দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায়, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ (Nakba) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণকে নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে পদ্ধতিগতভাবে উচ্ছেদ ও জবরদস্তিমূলক স্থানান্তর প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ‘রোম সংবিধি’ (Rome Statute)-র অনুচ্ছেদ ৭ (মানবধর্মের বিরুদ্ধে অপরাধ) এবং অনুচ্ছেদ ৮ (যুদ্ধাপরাধ)-এ বর্ণিত আইনি নীতির আলোকে এই পদ্ধতিগত উচ্ছেদ ও জবরদস্তি মানবজাতির যৌথ বিবেকের ওপর চরম আঘাত। বর্ণবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন (ICERD – 1965) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক চিহ্নিত বর্ণবাদী ব্যবস্থা (Apartheid) চাপিয়ে দিয়ে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (UDHR) প্রতিশ্রুত সমান মানবিক মর্যাদাকে আজ বিপর্যস্ত করা হচ্ছে।

​এই সংকটের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী দিক হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নির্মিত সার্বজনীন আইনি কাঠামোর চরম অবমূল্যায়ন। ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪৯-এ অধিকৃত ভূখণ্ডে দখলদার শক্তির নিজস্ব জনগণকে পুনর্বাসন ও স্থানীয়দের স্থানান্তরিত করা স্পষ্টত নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও, তা প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) সাম্প্রতিক আদেশ ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাধিক প্রস্তাবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বিশ্ব আইনশৃঙ্খলার নৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দিচ্ছে। বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারের দরুন বহুপক্ষীয় কূটনীতির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে ‘জোর যার মুলুক তার’ (Might is Right) নীতি। এটি যে-কোনো শান্তিকামী ও ছোট রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষা ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য এক ঝুলন্ত খড়্‌গ।

​ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং বৈশ্বিক শক্তি ও জ্বালানির কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক সামরিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রক্সি সংঘাত এবং বিশ্ব রাজনীতির অশুভ মেরূকরণ সমগ্র মানবজাতিকে এক সর্বাত্মক পারমাণবিক ও বৈশ্বিক যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত অশুভ সংকেতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধ সরঞ্জামের আধুনিকীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের এই যুগে, ভূ-রাজনৈতিক উন্মাদনার যে-কোনো ভুল পদক্ষেপ মানবজাতিকে এক সম্মিলিত বিলুপ্তির দিকে চালিত করতে পারে।

​একই সাথে এই সংঘাতের পরোক্ষ মাশুল গুনতে হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সংবেদনশীল জলবায়ু অঞ্চলকে। লোহিত সাগর ও সংলগ্ন কৌশলগত বাণিজ্য পথগুলোতে ক্রমাগত অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Global Supply Chain) বাধাগ্রস্ত করছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের সুউচ্চমাত্রার বিস্ফোরক, অবকাঠামো ধ্বংস এবং রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার কেবল স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে না, বরং বায়ুমণ্ডলে চরম অনাকাঙ্ক্ষিত কার্বন নিঃসরণ ঘটিয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করছে।

​তবে এই অন্ধকারের মাঝেও ধর্মনিরপেক্ষ ও বিবেকী কণ্ঠস্বরের সোচ্চার উপস্থিতি আশার আলো দেখায়। প্রাক-১৯৪৮ যুগের সংঘাতহীন ব্যবস্থার সমর্থক এবং প্রখ্যাত চিন্তাবিদ মার্টিন বুবের (Martin Buber) সহ অসংখ্য ইহুদি পণ্ডিত ও মানবাধিকার সংগঠন—যেমন ‘Jewish Voice for Peace’—এর সোচ্চার প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, একটি আগ্রাসী সামরিক রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং প্রাচীন ইহুদি ধর্মের আত্মিক ঐতিহ্য কখনোই এক নয়। আজ বিশ্বজুড়ে গ্লোবাল সাউথ (Global South)-এর সচেতন জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরুণ সমাজের জাগরণ পশ্চিমা দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নতুন মুক্তিকামী বিশ্বজনমত গড়ে তুলছে।

​কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় দর্শন যখন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে, মানবিক বোধকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলে বন্দি করে এবং সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তাকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অশুভ সংকেতের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন তা আর কোনো একক ভৌগোলিক ভূখণ্ডের স্থানীয় বিরোধ থাকে না—বরং তা সভ্যতার নৈতিক স্থবিরতা প্রকাশ করে। বহুপক্ষীয় কূটনীতির পুনর্জাগরণ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আগামী প্রজন্মের শান্তিময় ভবিষ্যতের স্বার্থেই আজ বিশ্ব সম্প্রদায়কে সমন্বিত ও কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা, ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণ এবং মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এটি স্পষ্ট অনুধাবন করা জরুরি যে—যায়নবাদ আজ কেবল একটি ভূখণ্ডের আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং তা সমগ্র মানব অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি।

লেখক: শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

যায়নবাদ: মানব অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি

প্রকাশের সময় : ০৬:০২:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের পরোক্ষ প্রভাবে উদ্ভূত রাজনৈতিক যায়নবাদ (Zionism) মূলত ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ভূমিতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি ও মানবাধিকারের বাস্তবতায় এই দর্শনের সামরিক ও চরমপন্থি প্রয়োগ কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভূখণ্ডগত দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেন্টের (Hannah Arendt) সতর্কবার্তার কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে যখন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ অন্যায়কে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতায় রূপ দেয়, তখন তা মানবীয় চেতনার মূলে আঘাত হানে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দর্শনের চরমপন্থি অনুশীলন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা, সর্বজনীন মানবিক মর্যাদা এবং শাশ্বত বিশ্বশান্তির ভিত্তিকে ক্ষয়িষ্ণু করে এক গভীর সর্বজনীন সংকটে রূপ নিয়েছে।

​প্রখ্যাত চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদের (Edward Said), ‘অরিয়েন্টালিজম’ (Orientalism) তত্ত্বের আলোকেও এই সংকটের মূল শিকড় অনুধাবন করা সম্ভব। সেখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোয় অনুন্নত বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিতভাবে অবমূল্যায়ন করে তাদের ওপর দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায়, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ (Nakba) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণকে নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে পদ্ধতিগতভাবে উচ্ছেদ ও জবরদস্তিমূলক স্থানান্তর প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ‘রোম সংবিধি’ (Rome Statute)-র অনুচ্ছেদ ৭ (মানবধর্মের বিরুদ্ধে অপরাধ) এবং অনুচ্ছেদ ৮ (যুদ্ধাপরাধ)-এ বর্ণিত আইনি নীতির আলোকে এই পদ্ধতিগত উচ্ছেদ ও জবরদস্তি মানবজাতির যৌথ বিবেকের ওপর চরম আঘাত। বর্ণবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন (ICERD – 1965) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক চিহ্নিত বর্ণবাদী ব্যবস্থা (Apartheid) চাপিয়ে দিয়ে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে (UDHR) প্রতিশ্রুত সমান মানবিক মর্যাদাকে আজ বিপর্যস্ত করা হচ্ছে।

​এই সংকটের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী দিক হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নির্মিত সার্বজনীন আইনি কাঠামোর চরম অবমূল্যায়ন। ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪৯-এ অধিকৃত ভূখণ্ডে দখলদার শক্তির নিজস্ব জনগণকে পুনর্বাসন ও স্থানীয়দের স্থানান্তরিত করা স্পষ্টত নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও, তা প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) সাম্প্রতিক আদেশ ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাধিক প্রস্তাবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বিশ্ব আইনশৃঙ্খলার নৈতিক ভিত্তিকে ধসিয়ে দিচ্ছে। বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারের দরুন বহুপক্ষীয় কূটনীতির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে ‘জোর যার মুলুক তার’ (Might is Right) নীতি। এটি যে-কোনো শান্তিকামী ও ছোট রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষা ও সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য এক ঝুলন্ত খড়্‌গ।

​ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং বৈশ্বিক শক্তি ও জ্বালানির কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক সামরিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রক্সি সংঘাত এবং বিশ্ব রাজনীতির অশুভ মেরূকরণ সমগ্র মানবজাতিকে এক সর্বাত্মক পারমাণবিক ও বৈশ্বিক যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত অশুভ সংকেতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধ সরঞ্জামের আধুনিকীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের এই যুগে, ভূ-রাজনৈতিক উন্মাদনার যে-কোনো ভুল পদক্ষেপ মানবজাতিকে এক সম্মিলিত বিলুপ্তির দিকে চালিত করতে পারে।

​একই সাথে এই সংঘাতের পরোক্ষ মাশুল গুনতে হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সংবেদনশীল জলবায়ু অঞ্চলকে। লোহিত সাগর ও সংলগ্ন কৌশলগত বাণিজ্য পথগুলোতে ক্রমাগত অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Global Supply Chain) বাধাগ্রস্ত করছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের সুউচ্চমাত্রার বিস্ফোরক, অবকাঠামো ধ্বংস এবং রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার কেবল স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে না, বরং বায়ুমণ্ডলে চরম অনাকাঙ্ক্ষিত কার্বন নিঃসরণ ঘটিয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করছে।

​তবে এই অন্ধকারের মাঝেও ধর্মনিরপেক্ষ ও বিবেকী কণ্ঠস্বরের সোচ্চার উপস্থিতি আশার আলো দেখায়। প্রাক-১৯৪৮ যুগের সংঘাতহীন ব্যবস্থার সমর্থক এবং প্রখ্যাত চিন্তাবিদ মার্টিন বুবের (Martin Buber) সহ অসংখ্য ইহুদি পণ্ডিত ও মানবাধিকার সংগঠন—যেমন ‘Jewish Voice for Peace’—এর সোচ্চার প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, একটি আগ্রাসী সামরিক রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং প্রাচীন ইহুদি ধর্মের আত্মিক ঐতিহ্য কখনোই এক নয়। আজ বিশ্বজুড়ে গ্লোবাল সাউথ (Global South)-এর সচেতন জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরুণ সমাজের জাগরণ পশ্চিমা দ্বিমুখী নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নতুন মুক্তিকামী বিশ্বজনমত গড়ে তুলছে।

​কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় দর্শন যখন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে, মানবিক বোধকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলে বন্দি করে এবং সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তাকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অশুভ সংকেতের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন তা আর কোনো একক ভৌগোলিক ভূখণ্ডের স্থানীয় বিরোধ থাকে না—বরং তা সভ্যতার নৈতিক স্থবিরতা প্রকাশ করে। বহুপক্ষীয় কূটনীতির পুনর্জাগরণ, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আগামী প্রজন্মের শান্তিময় ভবিষ্যতের স্বার্থেই আজ বিশ্ব সম্প্রদায়কে সমন্বিত ও কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা, ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণ এবং মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এটি স্পষ্ট অনুধাবন করা জরুরি যে—যায়নবাদ আজ কেবল একটি ভূখণ্ডের আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং তা সমগ্র মানব অস্তিত্ব ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক ক্রমবর্ধমান হুমকি।

লেখক: শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট।