‘অর্থনীতির শক্তিশালী খাত হতে পারে সৃষ্টিশীল কাজের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা’

- প্রকাশের সময় : ০৯:১১:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 5
বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত করে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চায় সরকার। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং দেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, দেশের শিল্পী, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকর্মী ও কারুশিল্পীদের সৃষ্টিশীল কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে নতুন একটি শক্তিশালী খাত গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য সরকার বেসরকারি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস: মডার্ন অ্যান্ড কনটেম্পোরারি আর্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় শিল্প ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ এসব বিষয় বাঙালির মনন, প্রাণ ও আত্মার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মানুষ শিল্প, সংগীত ও থিয়েটার ভালোবাসলেও এসব সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে সৃজনশীল শিল্পের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। সেখানে থিয়েটারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পরিবেশ, শিল্পকলা প্রদর্শনী, নকশাপণ্যের দোকান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজন মানুষের ব্যয় বাড়ায়, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান রাখে। বাংলাদেশেও এ ধরনের পরিবেশ তৈরি করা গেলে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার মতো সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্রিক জায়গার অভাব রয়েছে। এ ধরনের স্থান গড়ে তোলা গেলে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়বে এবং দর্শনার্থীদের ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নীতি ও অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোগগুলো কার্যকর করতে অংশীদারত্ব প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে থিয়েটারকেন্দ্রিক এলাকা গড়ে তোলা, চলচ্চিত্র ও সংগীতের প্রচার এবং শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক মূল্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, সম্প্রতি পাহাড়ি এক শিল্পী তার আঁকা কয়েকটি ছবি নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। ছবিগুলোর বিষয়বস্তু ও শিল্পমান দেখে আমি প্রতিটি পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে সেগুলো কিনেছি। পরে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ওই শিল্পীর চিত্রকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রতিটি ছবির মূল্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যথাযথ পরিচিতি, প্রদর্শনীর সুযোগ ও বাজার তৈরি করা গেলে শিল্পীদের কাজের মূল্য অনেক বাড়ানো সম্ভব। একইভাবে সংগীত, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও কারুশিল্পের ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।
কারুশিল্পীদের সহায়তার পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নকশা প্রণয়ন, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন বিপণনে সহযোগিতা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে অ্যামাজন, ইবে, আলিবাবাসহ আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতে সৃজনশীল শিল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, শিল্প-সংস্কৃতি কেবল ব্যবসা বা ঐতিহ্যের বিষয় নয়, এটি দেশের ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারেরও মাধ্যম। বাংলাদেশের সংগীত, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও কারুশিল্প বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের নিজস্ব পরিচিতি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি জানান, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগগুলো সফলভাবে এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতে আরও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোও এ কাজে যুক্ত হচ্ছে।
আমির খসরু বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেশের ইতিহাস, মানুষ ও পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরে। ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস’ বইটি বাংলাদেশের আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পকলার বৈচিত্র্য, শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতা এবং তাদের কাজের পেছনের গল্প তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, শিল্প মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্রিত করে। সৃজনশীলতা শুধু সংস্কৃতি ও পরিচয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার প্রসার, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, সৃজনশীলতার মাধ্যমে মূল্য সৃষ্টি, রফতানি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
সারাহ কুক আরও বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পাশাপাশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব রয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।






















