বাড়িভাড়া আকাশছোঁয়া, বিক্ষোভে উত্তাল স্পেনের রাজপথ
- প্রকাশের সময় : ১২:৩৯:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 3
আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় জরুরি আইন পাস না হওয়ায় স্পেনজুড়ে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। শনিবার রাজধানী মাদ্রিদসহ ভ্যালেন্সিয়া, বার্সেলোনা ও অন্যান্য শহরে প্রায় ৫০টি সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগকারী তহবিলগুলোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সরকারের প্রস্তাবিত আবাসন সংস্কার আইন সংসদে পাস না হওয়াকে। শুক্রবার স্পেনের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী জোট সরকারের দুটি জরুরি আবাসন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এর পরদিনই দেশজুড়ে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের দাবি, রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। ফলে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে আয়োজক ও সরকারের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধার উচ্ছেদ ঘিরে আন্দোলনের সূত্রপাত
সাম্প্রতিক আবাসন আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে মাদ্রিদের বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনায়। বাড়িভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তা পরিশোধ করতে না পারার পর গত মাসে তাকে বাসা ছাড়তে হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়।
আন্দোলনকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ বন্ধ এবং আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগকারী তহবিলগুলোর বাড়ি কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়ে আসছেন।
সামাজিক চাপের মুখে আবাসকাল যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেটির মালিক প্রতিষ্ঠান উরবাগেস্তিওনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাকে কম ভাড়ায় আবার সেখানে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। তবে ওই সমঝোতার পরও বিক্ষোভ থামেনি।
সংসদে সরকারের আবাসন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
আবাসন সংকট কমানোর উদ্যোগ হিসেবে সানচেজের সরকার শুক্রবার পার্লামেন্টে দুটি পৃথক প্রস্তাব উপস্থাপন করে। প্রথম প্রস্তাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখা, ২০২৮ সালের আগে শেষ হওয়ার কথা থাকা ভাড়ার চুক্তি আরও দুই বছর বাড়ানো, পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত অ্যাপার্টমেন্টে কর বাড়ানো এবং বড় বিনিয়োগ তহবিলের আবাসিক সম্পত্তি কেনার ওপর বিধিনিষেধের কথা বলা হয়।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে ভাড়ার চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থা রাখার কথা ছিল। ভাড়াটিয়া ইউনিয়নসহ বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান দাবি ছিল এটি।
তবে সংসদে প্রথম প্রস্তাবটি ১৭৮-১৭২ ভোটে এবং দ্বিতীয়টি ১৮৪-১৬৬ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। সরকারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি ও ডানপন্থী ভক্স। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সানচেজ সরকারকে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। কিন্তু কাতালোনিয়ার মধ্য-ডানপন্থী স্বাধীনতাপন্থী দল জুন্টসও শেষ মুহূর্তে প্রস্তাব দুটির বিরোধিতা করায় সেগুলো পাসের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
মাদ্রিদে ব্যাপক বিক্ষোভ
শনিবার মাদ্রিদে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা। তারা ভাড়াবৃদ্ধির প্রতিবাদে স্লোগান দেন এবং আবাসনকে মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার দাবি জানান।
অনেক বিক্ষোভকারী হাতে থাকা ঘরের চাবি ঝাঁকিয়ে স্লোগান দেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পুয়ের্তা দেল সলেও কয়েক দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা।
এক বিক্ষোভকারী স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, তারা আনন্দ বা আরামের জন্য রাস্তায় নামেননি; বরং নিজেদের বিশ্বাস ও দাবির প্রতি দৃঢ় অবস্থান থেকেই আন্দোলনে এসেছেন।
২৬ বছর বয়সী গ্রন্থাগারকর্মী মার্কোস সাইন্স জানান, আগে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাট ভাগাভাগি করে থাকতেন এবং মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন মাদ্রিদে একটি কক্ষের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াই অনেক ক্ষেত্রে ১ হাজার ইউরো ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। অন্যথায় অনেককেই মাদ্রিদ ছেড়ে যেতে হবে।
ভ্যালেন্সিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
সব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল না। পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ায় কিছু বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে একটি আবাসন ও সম্পত্তিবিষয়ক সম্মেলন চলাকালে প্যালাউ দে লেস আর্টস রেইনা সোফিয়ার কাছে বিক্ষোভ হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড সরিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে বস্তু ছুড়ে মারলে পুলিশ রাবার বুলেটসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় নয়জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
মাদ্রিদেও ডানপন্থী একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর তিন সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন নাৎসি অভিবাদন প্রদর্শন করে বিক্ষোভকারীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
স্পেনে বাড়ির ঘাটতি প্রায় ৭ লাখ
স্পেনের আবাসন সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতিকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংক অব স্পেনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নির্মাণ ও আবাসনের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কারণে দেশে প্রায় ৭ লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে।
এর সঙ্গে বাড়ির দামও দ্রুত বাড়ছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান আইডিয়ালিস্তার তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে স্পেনে ভাড়ার খরচ ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। মাদ্রিদে এই বৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদ বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভাড়ার শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রতি বর্গমিটারে ভাড়া যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮০ ইউরো ও ২২ দশমিক ৭০ ইউরো।
সাধারণ ধর্মঘটের ডাক
আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন এখন শুধু ভাড়া কমানোর দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। মাদ্রিদের ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন সরকার প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করলেও সংসদে সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হওয়াকে সংকট আরও গভীর হওয়ার কারণ হিসেবে দেখছে।
সংগঠনটি আবাসন সংকটের প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক চাপেও সানচেজ
আবাসন সংকট এখন স্পেনের রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করেছে। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসে ব্যর্থতা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সংখ্যালঘু জোট সরকারের দুর্বলতা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে। স্প্যানিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে নভেম্বরেই আগাম নির্বাচন হতে পারে বলে জল্পনা চলছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকার সোশ্যালিস্ট পার্টি ও জোটসঙ্গী সুমারকে নিয়ে গঠিত। সংসদে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে আবাসন সংকটের মতো জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও সরকারকে অন্য দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আবাসন সংকট, ক্রমবর্ধমান ভাড়া ও বাড়ির মূল্য এবং সংসদে সরকারের সংস্কার প্রস্তাবের ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে স্পেনে এখন রাজপথের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পাশাপাশি বাড়ছে।





















