নিজ দলেই তোপের মুখে দেশে ফেরা নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
- প্রকাশের সময় : ০২:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 13
নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতারা তাকে আবার দলের সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে তার নেতৃত্বেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে দলটির একাংশ তাকে আর সভাপতি হিসেবে চায় না।
নেপালের সুপ্রিম কোর্ট গত ১৭ এপ্রিলের রায় পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ার পর দেউবা-ঘনিষ্ঠ শিবির এই প্রস্তাব সামনে এনেছে। ওই রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কমিটিকে দলের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
এখন দেউবা-সমর্থক নেতারা বলছেন, সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করা অথবা দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলন আয়োজন করা।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাত বলেন, আমরা হয় আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারি, অথবা ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে শের বাহাদুর দেউবার নেতৃত্বে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিকে গ্রহণ করে সাধারণ সম্মেলনের দিকে এগোতে পারি।
তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ১৫তম সাধারণ সম্মেলন দেউবার নেতৃত্বেই হওয়া উচিত। বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটিকে তিনি একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মহাত আরও বলেন, আদালত যেহেতু আগের রায় পুনর্বিবেচনায় সম্মত হয়েছে, তাই অপর পক্ষ যদি দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলন করতে রাজি থাকে, তাহলে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এর মধ্যেই দলের ঐক্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দেউবার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে একত্র করা সহজ হবে বলেও দাবি করেন মহাত। তার ভাষায়, দেউবার নেতৃত্বে সবাই একসঙ্গে আসতে পারবেন এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কোণঠাসা করা হবে না।
পাঁচ মাস পর দেশে ফিরলেন দেউবা
পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দুই মেয়াদে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি দেউবা প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফিরেছেন।
বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি কাঠমান্ডুর চুন্ডেভিতে তার সমর্থক গোষ্ঠীর যোগাযোগ কার্যালয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই দলীয় নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন। তাদের অনুরোধে দেউবা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, রাজতান্ত্রিক পঞ্চায়েত আমল, রাজা জ্ঞানেন্দ্রর সরাসরি শাসন কিংবা বর্তমান রাস্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ও তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। দেউবা প্রশ্ন করেন, রাজা জ্ঞানেন্দ্র পারেননি; এখানে আর কেউ কি তা করতে পারবেন?
চুন্ডেভিতে যাওয়ার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেউবা কংগ্রেসের ভেতরের মতবিরোধ ও অসন্তোষের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান। দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভোটারদের দলের ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাসকে সম্মান করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
দেউবা আরও বলেন, কংগ্রেসের রাজনীতিতে তরুণ নেতাদের সামনে এগিয়ে আসা উচিত। তবে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের অযোগ্য বা মূল্যহীন হিসেবে উপস্থাপন করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কোনো নেতাকে দলীয় দায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি।
বিশেষ সম্মেলন থেকেই বিরোধের শুরু
নেপালি কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব সংকটের সূত্রপাত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সম্মেলনকে ঘিরে। সাধারণ সম্মেলনের ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধি এই সম্মেলনের দাবি জানিয়েছিলেন। সেখানে গগন থাপাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
নির্বাচন কমিশন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর দেউবা শিবির সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায়।
গত ১৭ এপ্রিল আদালতের একটি বেঞ্চ থাপার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে প্রায় তিন মাস ধরে চলা নেতৃত্ব সংকটের একটি পর্যায়ের অবসান ঘটে এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
এরপর দেউবা শিবির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। তাদের দাবি ছিল, আদালতের আগের রায়ে আইনগত ত্রুটি রয়েছে। প্রাথমিক পর্যালোচনার পর ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করে। পরে আদালত পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ায় দলটির নেতৃত্ব নিয়ে আইনি প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
দেউবাকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবে আপত্তি থাপা শিবিরের
দলের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ পৌডেল দেউবাকে আবার সভাপতি করার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আবার সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ সম্মেলনে যাওয়া আইনগত, প্রক্রিয়াগত ও রাজনৈতিক—কোনো দিক থেকেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
পৌডেল বলেন, দেউবা এরই মধ্যে দুই মেয়াদে দলের সভাপতি ছিলেন। তাই তার উচিত দলীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে থেকে দলের বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা।
তিনি বলেন, তারা আশা করেছিলেন দেউবা নিজেই বলবেন, আমি সভাপতি নই, তাই আমাকে সভাপতি বলে ডাকবেন না। এখনো তারা বিশ্বাস করেন, দেউবা দলের ঐক্যের জন্য উদ্যোগ নেবেন।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে দেউবার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানান গগন থাপা। তিনি বলেন, সাবেক সভাপতি দেউবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তিনি তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন।
দেউবার বিরুদ্ধে অর্থপাচার তদন্তও চলছে
নেতৃত্বের সংকটের পাশাপাশি দেউবার আইনি জটিলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি বিদেশে থাকার সময় দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।
দেউবা ও তার স্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে কাঠমান্ডু জেলা আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
তবে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট দেউবা দম্পতিকে গ্রেফতার না করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, ওই গ্রেফতারি পরোয়ানার আইনগত বৈধতা নেই। অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের তদন্তাধীন অপরাধ বিশেষ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং গ্রেপ্তারের জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইন্টারপোলও দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তবে অর্থপাচার তদন্ত এখনো চলছে। জুলাইয়ে তদন্তকারীরা বিশেষ আদালতে একটি অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
দেউবার ব্যক্তিগত সচিব ভানু দেউবা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে ফিরে আসার পর এই তদন্তের বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট



















