উৎপাদন খরচের চ্যালেঞ্জ জয় করলেই আর্ট চুক্তি হতে পারে বাংলাদেশের নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা
- প্রকাশের সময় : ১১:২৪:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 205
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তি এখন দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে। এই চুক্তি কেবল একটি শুল্ক–সুবিধার সমঝোতা নয়; বরং এতে সংযুক্ত নানা শর্ত ও কাঠামো বাংলাদেশের প্রকৃত রপ্তানি আয় ও মুনাফার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সাত হাজারেরও বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে এবং প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একই সুবিধা উপভোগ করবে। তবে আলোচনার মূল বিষয়টি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির প্রশ্ন। কারণ, মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে শূন্য শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
এখানেই সৃষ্টি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব। মার্কিন তুলা তুলনামূলকভাবে বেশি দামের, ফলে উৎপাদন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় অন্য দেশের তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক, এমনকি তার ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলেও, বাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তা থাকতে পারে। অর্থাৎ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও উচ্চ কাঁচামাল ব্যয় রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবুও বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর নতুন প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, যেখানে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়। ভারত যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে ইউরোপীয় বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সেই বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যতদিন না ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো পৃথক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে, ততদিন বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ অপরিহার্য।
রাজস্ব ও মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি খুব বেশি লাভজনক নাও মনে হতে পারে। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে অর্ডার নিশ্চিত করা গেলে এবং উৎপাদন ব্যয় দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে চিত্রটি পাল্টে যেতে পারে। এই চুক্তির মূল শক্তি নিহিত রয়েছে পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে। অর্থাৎ কেবল উচ্চ মুনাফার হার নয়, বরং বৃহৎ রপ্তানি পরিমাণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক মার্কিন পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ফলে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের আমদানি শুল্ক রাজস্ব হ্রাসের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন ও বড় ক্রেতা অর্জন এবং উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই চুক্তিকে ইতিবাচক ফলাফলে রূপ দেওয়া সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি সমর্থন এবং শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮.৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া অসম্ভব নয়।
অতএব, আর্ট চুক্তি নিজে থেকে সাফল্য এনে দেবে না; বরং খরচ নিয়ন্ত্রণ, বাজার কৌশল ও পণ্য বৈচিত্র্যের সঠিক প্রয়োগই নির্ধারণ করবে এর প্রকৃত সুফল। এখনই সময় দৃঢ় ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার, যাতে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

























