বসন্তদিনে
- প্রকাশের সময় : ১১:১৫:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 167
১৪ ফেব্রুয়ারি। শনিবার। পহেলা ফাল্গুন। বিকেলে উদীচীর সভা ছিল। অন্যান্য দিনের মতো মোটরবাইক নিয়ে বের হই। শহীদ খুশি রেলওয়ে মাঠে আসতেই একটা উৎসবের আমেজ মনে হলো। হলুদের সমারোহ। মনে হচ্ছিলো আমগাছের মুকুলের মতো তরুণ-তরুণীরাও হলুদে সেজেছে। কিছু দুর সামনে এগুলেই পান্না চত্বর। সেখানে ফুলের দোকানগুলোতে ভীড়। কেউ ফুল কিনছে। কেউ ছবি তুলছে। সবার চোখেমুখে আনন্দের চিহ্ন। আজাদী ময়দান আসার পর একজন বললো, ভাই ভালোবাসা দিবস। আপনার ফুল কই?
হ্যাঁ। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। মূলত দিনটি আমাদের তরুণ সমাজ উদযাপন করে। এদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে নানা আয়োজনে বিভিন্ন দিবস পালিত হয়। ফেব্রুয়ারি মাসেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস রয়েছে। এই মাসেই বাংলাকে আর্ন্তজাতিক ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যা বিশ্বে এক বিরল ঘটনা। ভাষার প্রতি আমাদের গৌরবগাঁথা পুরো বিশ্ব আলোড়িত করেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের লাখো শহীদ জীবন দিয়েছেন। মা-বোনের সম্ভ্রম হারিয়েছেন। এতো ত্যাগের পরেও শিক্ষার অধিকার আদায়ের জন্য স্বাধীন দেশে লড়াই করতে হয়েছে। যদিও সেই লড়াই এখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ বলে একটি দিন বিদ্যমান রয়েছে। দিবসটি হলো ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের রয়েছে একটি ইতিহাস। যা আমাদের অনেকের অজানা। তখন দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ। এরশাদেও শাসনকাল ছিল ৯ বছর। এই শাসনকালে ১৯৮২ সালে তাঁর শিক্ষামন্ত্রী একটি শিক্ষানীতি প্রনয়ণ করেন। যা ড. মজিদ খান শিক্ষানীতি হিসেবে পরিচিত। এই শিক্ষানীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেজাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০ শতাংশ শিক্ষার ব্যয়ভার দেওয়ার সামর্থ থাকবে, তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। এই নীতিতে দরিদ্রেরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধিতা করে। কার্যত এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করে।
ইতিহাস সাক্ষী। ছাত্রসমাজ কখনো হারেনি। ড. মজিদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে একাট্টা হয় তৎকালীন ছাত্রসংগঠনগুলো। আন্দোলনের ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকে। পরের বছর ’৮৩-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সচিবালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের ওই কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ডাকা ওই সমাবেশে পুলিশ গুলি করলে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। শহীদ হন জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহাসহ অনেকেই। পরে সারা দেশেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামসহ দেশের অপরাপর স্থানেও হতাহতের ঘটনা ঘটায়। সেদিন থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে বলা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সারা দেশেই ঘটেছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা। প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী এমনকি সাধারণ মানুষকেও জেলে পুরে নির্যাতন করতে থাকে এরশাদ সরকার। এমন আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেনকে হত্যা করে এরশাদের পুলিশ বাহিনী। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এরশাদের সন্ত্রাসী বাহিনী গুলি করে হত্যা করে ডা. মিলনকে। এতেও শেষ রক্ষা হয় না এরশাদের। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয় এরশাদের।
এরপর থেকে এই দেশের ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে দিবসটি পালন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হতো। শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের জন্য রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। শহীদ স্মরণে এদিন ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। তবে এখনো শিক্ষা অধিকার বাস্তবায়ন হয়নি। দিবসটিকে আমরা ভুলে যেতে বসেছি। শহীদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, রাজবাড়ী জেলা সংসদ।
azazprothoma@yahoo.com

























