বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
রোনালদোর বিদায় এত সহজে হতে দেবে না পর্তুগাল আগামী বছর দুই ঈদে ১১ দিন ছুটি, প্রজ্ঞাপন জারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার জন্য ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মধুখালীতে কলেজের শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল, টানা তিন বছর শূন্য ফল, শিক্ষকদের শোকজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মারামারিসহ নানা বিতর্কিত কাণ্ডে ফিফার শাস্তির মুখে আর্জেন্টিনা নওগাঁয় ১১০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার, মাদকসেবী আটক বিশ্বকাপ হারের পর মায়ামির অনুশীলনে ফিরলেন মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেন রোনালদো উইলফ্রেড রোডসকে যে কারণে আপনার চেনা উচিত ব্রাজিলের ফুটবলাররা কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারছেন না

চীনের মন রক্ষায় কেন মরিয়া রিয়াল ও লা লিগা, কোথায় আটকা

স্পোর্টস ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৪:১৫:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • / 6
চীনের মন রক্ষায় কেন মরিয়া রিয়াল ও লা লিগা, কোথায় আটকা

একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে এক লাইনের রসিকতা। তার জেরে চীনের তিনটি ব্র্যান্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লিগের ম্যাচ দেখানো বন্ধ রেখেছে। ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে নিজে, লা লিগা এবং রিয়াল মাদ্রিদও।এমনকি স্পেনে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথাও বলেছেন লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। সংকট সামাল দিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর চীন সফরে যাওয়ারও কথা রয়েছে। এত কিছুর পরও মন গলছে না সিসিটিভির মূল প্রতিষ্ঠান চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি)। তাদের দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে ‘যথাযথভাবে ক্ষমা’ চাইতে হবে।চীনের এমন কঠোর অবস্থান আর দেশটিকে শান্ত করতে স্প্যানিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগের এমন নমনীয়তায় অনেকেরই ভ্রু কুঁচকেছে। চীনের ওপর এমন কী নির্ভরতা লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদের যে এতটা নত হতে হচ্ছে? কেউ কেউ অবশ্য জানেন, কারণটা অর্থনৈতিক। কিন্তু সেটা আসলে কতটা? ফুটবল দুনিয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি না হয়েও কীভাবে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ক্লাবকে চাপে ফেলে দিয়েছে চীন?

খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত

বিতর্কের সূত্রপাত ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ দেওয়া এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে তিনি বলেন, এমন একটি ভিডিও তাঁর ভালো লেগেছিল, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। কথাটি বলার সময় পর্দায় দেখা যায় চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব।মাওকে নিয়ে এমন ঠাট্টা চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২৭ অক্টোবর চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠান ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে। এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে ক্ষমা চায় লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও।২৮ অক্টোবর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর মধ্যেই চীনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের পরবর্তী ম্যাচ সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং, এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

চীনের বাজারে লা লিগার গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমে দেখতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের অর্থনীতি।ইউরোপের বড় ফুটবল লিগগুলোর আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব বিক্রি। নিজ দেশের বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সম্প্রচারক ও প্ল্যাটফর্মের কাছে এই স্বত্ব বিক্রি করে লিগগুলো। সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য নির্ভর করে দর্শকের আগ্রহ, বাজারের আকার, প্রতিযোগিতামূলক দর এবং চুক্তির শর্তের ওপর।লা লিগার একটি সূত্রের বরাতে এএফপির ২৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪–২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। সূত্রটির দাবি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে লা লিগার আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আসা আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোগায়।এখানে চীনের একক অবদান কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে দুই দেশের সম্মিলিত অবদানই যখন আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তখন চীনের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির বিশাল দর্শকগোষ্ঠী সম্প্রচারকদের জন্যও বড় আকর্ষণ। দর্শক বেশি হলে বিজ্ঞাপন বিক্রি, গ্রাহক ধরে রাখা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ থাকে। সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতেই সম্প্রচারস্বত্বের দর নির্ধারিত হয়।

ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

চীনসহ এশিয়ার বাজার ধরার জন্য লা লিগার পরিকল্পনা বেশ আগের। ২০১৬ সাল থেকে লা লিগা তাদের ম্যাচের সূচি এশীয় সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়েছে, যাতে এ অঞ্চলের দর্শকেরা সুবিধাজনক সময়ে খেলা দেখতে পারেন। লক্ষ্য ছিল দর্শকসংখ্যা বাড়ানো, সেই সূত্রে বাড়ানো সম্প্রচারস্বত্বের মূল্যও।যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম সিটি এএমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই সময় থেকে লা লিগা আটটি দেশে নয়টি কার্যালয় খুলেছে। এর মধ্যে দুটি চীনে। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তির খবর দিয়েছিল এবিইউ (এশিয়া-প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন)। চুক্তির মোট মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরো।

সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ এ বছরের আগস্টে মিগুর সঙ্গে চুক্তি। ৩ আগস্ট লা লিগা ঘোষণা করে, চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ মৌসুম পর্যন্ত মূল ভূখণ্ড চীনে লিগটির একচ্ছত্র ডিজিটাল সম্প্রচার সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে লা লিগার ৩৮০টি ম্যাচই মিগুতে দেখার সুযোগ পাবেন চীনের দর্শকেরা।চুক্তির অর্থমূল্য প্রকাশ করা হয়নি। বেইজিংয়ে গিয়ে তেবাস নিজেই চুক্তি সই করেছেন। মজার বিষয়, এ-সংক্রান্ত লা লিগার বিজ্ঞপ্তিতে চীনা দর্শকদের কাছে লিগটির আকর্ষণ হিসেবে এমবাপ্পের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।এ ছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিএমজির সঙ্গে ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের চুক্তিও করে লা লিগা। ফুটবল এসপানার প্রতিবেদনে তেবাসের বরাতে বলা হয়েছে, চীনে লা লিগার সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য কয়েক বছরে কমে গিয়েছিল। বিনা মূল্যে সম্প্রচারের মাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে সেই মূল্য ফিরিয়ে আনাই ছিল লক্ষ্য।চুক্তিটি সই হয়েছিল সিএমজির প্রধান শেন হাইশিয়ংয়ের সঙ্গে। তিনি একই সঙ্গে চীনের প্রচারবিষয়ক উপমন্ত্রী। অর্থাৎ স্প্যানিশ ফুটবল লিগটির সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে দরকষাকষির টেবিলের অপর প্রান্তে শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থাও।

লা লিগার স্বার্থ যেখানে মূলত সম্প্রচারস্বত্ব ও লিগের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে, রিয়াল মাদ্রিদের হিসাব সেখানে আরও বিস্তৃত। জার্সি, মার্চেন্ডাইজ, স্পনসরশিপ এবং ক্লাবের ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক মূল্য—সবকিছুর সঙ্গেই চীনের বাজারের সম্পর্ক রয়েছে।স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুসারে, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি ও অন্যান্য মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। টাকার অঙ্কে কত, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংখ্যাটি যে কম নয়, তা বোঝা যায় ক্লাবটির সামগ্রিক ব্যবসার আকার থেকে।ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো, যা ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

চীনের মন রক্ষায় কেন মরিয়া রিয়াল ও লা লিগা, কোথায় আটকা

প্রকাশের সময় : ০৪:১৫:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে এক লাইনের রসিকতা। তার জেরে চীনের তিনটি ব্র্যান্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লিগের ম্যাচ দেখানো বন্ধ রেখেছে। ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে নিজে, লা লিগা এবং রিয়াল মাদ্রিদও।এমনকি স্পেনে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথাও বলেছেন লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস। সংকট সামাল দিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর চীন সফরে যাওয়ারও কথা রয়েছে। এত কিছুর পরও মন গলছে না সিসিটিভির মূল প্রতিষ্ঠান চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি)। তাদের দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে ‘যথাযথভাবে ক্ষমা’ চাইতে হবে।চীনের এমন কঠোর অবস্থান আর দেশটিকে শান্ত করতে স্প্যানিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগের এমন নমনীয়তায় অনেকেরই ভ্রু কুঁচকেছে। চীনের ওপর এমন কী নির্ভরতা লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদের যে এতটা নত হতে হচ্ছে? কেউ কেউ অবশ্য জানেন, কারণটা অর্থনৈতিক। কিন্তু সেটা আসলে কতটা? ফুটবল দুনিয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি না হয়েও কীভাবে ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ক্লাবকে চাপে ফেলে দিয়েছে চীন?

খেলার মাঠের প্রেক্ষাপট ও মূল মুহূর্ত

বিতর্কের সূত্রপাত ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ দেওয়া এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে তিনি বলেন, এমন একটি ভিডিও তাঁর ভালো লেগেছিল, যেখানে তাঁর মুখ বসানো হয়েছিল একজন ‘চীনা স্বৈরশাসকের’ শরীরে। কথাটি বলার সময় পর্দায় দেখা যায় চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব।মাওকে নিয়ে এমন ঠাট্টা চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২৭ অক্টোবর চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠান ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে। এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে ক্ষমা চায় লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও।২৮ অক্টোবর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা এমবাপ্পের ক্ষমা প্রার্থনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এর মধ্যেই চীনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের পরবর্তী ম্যাচ সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্যান্ডউইচের গোল রুটি থেকে মাও সে–তুং, এমবাপ্পের ‘ডিক্টেটর’ মিমে চীন–স্পেন সম্পর্কে ঝড়

চীনের বাজারে লা লিগার গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমে দেখতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের অর্থনীতি।ইউরোপের বড় ফুটবল লিগগুলোর আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব বিক্রি। নিজ দেশের বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সম্প্রচারক ও প্ল্যাটফর্মের কাছে এই স্বত্ব বিক্রি করে লিগগুলো। সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য নির্ভর করে দর্শকের আগ্রহ, বাজারের আকার, প্রতিযোগিতামূলক দর এবং চুক্তির শর্তের ওপর।লা লিগার একটি সূত্রের বরাতে এএফপির ২৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪–২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। সূত্রটির দাবি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে লা লিগার আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আসা আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোগায়।এখানে চীনের একক অবদান কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে দুই দেশের সম্মিলিত অবদানই যখন আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তখন চীনের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির বিশাল দর্শকগোষ্ঠী সম্প্রচারকদের জন্যও বড় আকর্ষণ। দর্শক বেশি হলে বিজ্ঞাপন বিক্রি, গ্রাহক ধরে রাখা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ থাকে। সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতেই সম্প্রচারস্বত্বের দর নির্ধারিত হয়।

ম্যাচের বিশ্লেষণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

চীনসহ এশিয়ার বাজার ধরার জন্য লা লিগার পরিকল্পনা বেশ আগের। ২০১৬ সাল থেকে লা লিগা তাদের ম্যাচের সূচি এশীয় সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়েছে, যাতে এ অঞ্চলের দর্শকেরা সুবিধাজনক সময়ে খেলা দেখতে পারেন। লক্ষ্য ছিল দর্শকসংখ্যা বাড়ানো, সেই সূত্রে বাড়ানো সম্প্রচারস্বত্বের মূল্যও।যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম সিটি এএমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওই সময় থেকে লা লিগা আটটি দেশে নয়টি কার্যালয় খুলেছে। এর মধ্যে দুটি চীনে। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তির খবর দিয়েছিল এবিইউ (এশিয়া-প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন)। চুক্তির মোট মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরো।

সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ এ বছরের আগস্টে মিগুর সঙ্গে চুক্তি। ৩ আগস্ট লা লিগা ঘোষণা করে, চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগু ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ মৌসুম পর্যন্ত মূল ভূখণ্ড চীনে লিগটির একচ্ছত্র ডিজিটাল সম্প্রচার সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে লা লিগার ৩৮০টি ম্যাচই মিগুতে দেখার সুযোগ পাবেন চীনের দর্শকেরা।চুক্তির অর্থমূল্য প্রকাশ করা হয়নি। বেইজিংয়ে গিয়ে তেবাস নিজেই চুক্তি সই করেছেন। মজার বিষয়, এ-সংক্রান্ত লা লিগার বিজ্ঞপ্তিতে চীনা দর্শকদের কাছে লিগটির আকর্ষণ হিসেবে এমবাপ্পের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।এ ছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিএমজির সঙ্গে ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের চুক্তিও করে লা লিগা। ফুটবল এসপানার প্রতিবেদনে তেবাসের বরাতে বলা হয়েছে, চীনে লা লিগার সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য কয়েক বছরে কমে গিয়েছিল। বিনা মূল্যে সম্প্রচারের মাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে সেই মূল্য ফিরিয়ে আনাই ছিল লক্ষ্য।চুক্তিটি সই হয়েছিল সিএমজির প্রধান শেন হাইশিয়ংয়ের সঙ্গে। তিনি একই সঙ্গে চীনের প্রচারবিষয়ক উপমন্ত্রী। অর্থাৎ স্প্যানিশ ফুটবল লিগটির সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে দরকষাকষির টেবিলের অপর প্রান্তে শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থাও।

লা লিগার স্বার্থ যেখানে মূলত সম্প্রচারস্বত্ব ও লিগের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে, রিয়াল মাদ্রিদের হিসাব সেখানে আরও বিস্তৃত। জার্সি, মার্চেন্ডাইজ, স্পনসরশিপ এবং ক্লাবের ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক মূল্য—সবকিছুর সঙ্গেই চীনের বাজারের সম্পর্ক রয়েছে।স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুসারে, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি ও অন্যান্য মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। টাকার অঙ্কে কত, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংখ্যাটি যে কম নয়, তা বোঝা যায় ক্লাবটির সামগ্রিক ব্যবসার আকার থেকে।ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো, যা ফুটবল ক্লাবগুলোর মধ্যে বিশ্বে সর্বোচ্চ।