‘সংস্কারে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সঙ্গে নীতিগত ঐকমত্য, বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে সরকার’
- প্রকাশের সময় : ০৭:৪৭:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- / 10
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত। একই সঙ্গে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ কলকারখানা চালু, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণের প্রাক্কালে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত রূপরেখা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলে এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে সরকারের এই পরিকল্পনার বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের জনগণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষায় বেশি ব্যয় এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি চায়। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুরও প্রত্যাশা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কার ভাবনার সঙ্গেও এসব লক্ষ্যের মিল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকারের নিজস্ব সংস্কার রূপরেখা এবং আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর নীতিগত অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে। সংস্কারের লক্ষ্য ও অভীষ্ট নিয়েও ঐকমত্য আছে। ফলে সংস্কার কর্মসূচি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কারণ, এসব সংস্কারের মূল দায়িত্ব ও মালিকানা থাকবে রাজনৈতিক সরকারের হাতে।
তিনি বলেন, সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শের মধ্যে সমন্বয় থাকলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে সংস্কারের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারেরই থাকবে।
জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান ড. তিতুমীর। তার ভাষ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর সেই চাপ কমাতে সরকার জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেনি।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার দায় এখন সাধারণ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। এতে একদিকে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়েছে।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এই লক্ষ্যগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালু করা ও নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার বিশেষ অর্থায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, দেশে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক কলকারখানা বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।
এদিকে, থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। ড. তিতুমীর জানান, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে। বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক ফল নষ্ট হয়। এতে কৃষকরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল খাদ্যপণ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; বরং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়ানো।
এক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এর আওতায় কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হতে পারে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হতে পারে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা যেতে পারে। আবার কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তার মতে, দুই বন্দরের মধ্যে যোগাযোগ আরো গতিশীল করা গেলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।
ড. তিতুমীর বলেন, কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের অর্থায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একাধিক উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ আসবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ থেকে।
তিনি জানান, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি কর্পোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন প্ল্যাটফর্ম প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে সমন্বিত করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ছে। এডিবি ইতোমধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চায়।





















