একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাবার আহাজারি, ‘আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু চাই না’
- প্রকাশের সময় : ০৬:৫৯:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 9
মাত্র কয়েক দিন আগেও একমাত্র ছেলে আভানকে নিয়ে গর্বের কথা লিখেছিলেন বাবা মৃদুল ইসলাম। প্লে গ্রুপ থেকে নার্সারিতে ওঠার আনন্দে ছেলের ছবি দিয়ে ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘জীবন শুধু ফলাফলে মাপা যায় না, হৃদয়ের আনন্দ, সাহস, মমতা আর ভালোবাসাই জীবনের আসল অর্জন।’ ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে শেষে লিখেছিলেন, ‘বাবা তোমাকে ভালোবাসে এবং তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’
সেই শিশুই এখন আর নেই। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে সাড়ে চার বছর বয়সী আভান।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন মৃদুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
মৃদুল বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’
সন্তানের মৃত্যুর পর কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। সে নাই, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
আভানকে ঘিরে পরিবারের নানা পরিকল্পনা ছিল জানিয়ে মৃদুল বলেন, ছেলেকে স্কুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
আভানকে সব সময় নিজের কাছেই রাখতেন এবং তার সঙ্গে ঘুরতেন বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে থাকার সময় আভান স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করছিল বলে দাবি করেন তার বাবা। বাসা থেকে পরিবারের সদস্যরা তার জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। শিশুটি বাবাকে ফোন করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিল বলে জানান তিনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা ডেঙ্গু সন্দেহে তার চিকিৎসা শুরু করেন।
তবে পরিবারের দাবি, হাসপাতালে একাধিকবার পরীক্ষা করানো হলেও ডেঙ্গুর ফল নেগেটিভ আসে। এরপরও ডেঙ্গুর বিষয়টি ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।
২ অক্টোবর আভানকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে শিশুটির চিকিৎসা চলছিল বলে দাবি তাদের।
স্বজনরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে তাদের জানিয়েছিল। তবে পরদিন শনিবার বিকেল ৫টার দিকে আভানের মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দেয় এবং শিশুটির মৃত্যু হয় বলে দাবি স্বজনদের।
চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকাল নথি পেতেও শুরুতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। পরে তারা এসব নথি সংগ্রহ করেন।
স্বজনদের দাবি, ওই মেডিক্যাল নথিতে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ও শক সিনড্রোমের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ভুল চিকিৎসার অভিযোগের বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিবার।
আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার।
শিশুটির মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন স্বজনরা। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
























