Dhaka ১০:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
পর্তুগালে জনসমক্ষে মুখঢাকা নিষিদ্ধ জরুরি ভিত্তিতে কৃষি ভিসা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিসিইউ সেবা পাবে যশোরবাসী মন্ত্রী-এমপিদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদলের আগাম সমালোচনা বিভ্রান্তিকর: রিজভী জামায়াত-আওয়ামী লীগের ‘পুরোনো প্রেম’ নিয়ে প্রশ্ন রাশেদ খাঁনের মাজবাড়ীর বাগগাড়ীতে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাবু মোল্লার উঠান বৈঠক বিশ্ববাজারে কমলে দেশেও তেলের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী কালুখালীতে এনসিপির ৬ মাস মেয়াদি আহ্বায়ক কমিটি জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ভাষণ নাটকের আলোয় রাজবাড়ী, শুরু হলো ‘নন্দনপার্বণ’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লেজার প্রযুক্তির অস্ত্র মোতায়েন, সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 9

ইরানের ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালিতে অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী এসব অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৫০ কোটি ডলারের প্রকল্পও হাতে নিয়েছে দেশটি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে লেজার প্রযুক্তি।

সম্প্রতি ইরানের আকাশে চোখধাঁধানো লেজার আলোর দৃশ্য দেখা গেছে। এগুলো কোনো বিনোদনমূলক আলোকসজ্জা নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ধ্বংস করছে বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।

যুক্তরাষ্ট্রের লেজার অস্ত্র উন্নয়নের কর্মসূচি প্রায় পাঁচ দশকের পুরোনো। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্ষমতার বিচারে এসব ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক এগিয়ে।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের প্রেসিডেন্ট মার্ক নাইস দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেন, নির্দিষ্টভাবে ড্রোন শনাক্ত করে সেটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যায়। এরপর লেজার রশ্মি প্রয়োজনীয় স্থানে কেন্দ্রীভূত করে ড্রোনের সেন্সর অকার্যকর করা কিংবা পুরো ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব।

যেভাবে কাজ করে লেজার অস্ত্র
লেজার অস্ত্রে জেনারেটর বা ব্যাটারি থেকে পাওয়া শক্তিকে ফোটনে রূপান্তর করা হয়। পরে ওই ফোটনগুলোকে একটি শক্তিশালী একক রশ্মিতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। সাধারণত খালি চোখে এই রশ্মি দেখা যায় না; ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা সম্ভব।

লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট একটি অংশে নির্দিষ্ট সময় ধরে লেজার রশ্মি স্থির রাখা হয়। এতে সেখানে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়। ফলে লক্ষ্যবস্তু গলে যেতে পারে কিংবা বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হতে পারে।

লেজার যুদ্ধবিষয়ক নিউজলেটার ‘লেজার ওয়ার্স’-এর লেখক জ্যারেড কেলার বলেন, এটি মূলত আলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি। কোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে কয়েক সেকেন্ড ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় লেজার রশ্মি ধরে রাখতে হয়।

তার মতে, পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের সময় এসেছে। তিনি বিশেষভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রায় ৫০ কোটি ডলারের চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যার আওতায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত লেজার অস্ত্র তৈরি করা হবে। এসব অস্ত্রে ফোটনকে লক্ষ্যবস্তুর ওপর কেন্দ্রীভূত করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হবে।

এক্সবক্স কন্ট্রোলার দিয়ে চালানো হচ্ছে লেজার অস্ত্র
অত্যাধুনিক এই সামরিক প্রযুক্তির কিছু ব্যবস্থা পরিচালনায় মার্কিন সেনারা পুনর্বিন্যাস করা এক্সবক্স গেম কনসোলের কন্ট্রোলার ব্যবহার করছেন।

কেলারের ব্যাখ্যা, ভিডিও গেম শিল্প বহু গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর কন্ট্রোলার তৈরি করেছে। তাই সামরিক বাহিনীও মনে করছে, একই ধরনের কন্ট্রোলার দিয়ে যদি কাজটি করা সম্ভব হয়, তাহলে আলাদা করে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন নেই।

এমনকি ‘হ্যালো’ গেমে স্পার্টান লেজার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থাকা কেউ বাস্তব জীবনের এ ধরনের অস্ত্রও পরিচালনা করতে পারবেন—এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।

মেক্সিকোর মাদক চক্রের ড্রোনেও প্রযুক্তির পরীক্ষা
লেজার প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের মাদক চক্রগুলোর ড্রোনও পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। মাদক কারবারিদের পাঠানো ড্রোন ধ্বংস করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডার প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করছে। এখন পর্যন্ত লেজার ব্যবহার করে অন্তত ১১টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আমেরিকান ফরেন পলিসি কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রেন্ট জিয়ারনিক বলেন, মাদক চক্রের হুমকি কমাতে বা তাদের কার্যক্রমে বাধা দিতে যেসব ব্যবস্থা কার্যকর, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লেজার দিয়ে ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা এখন আর কেবল কল্পনার বিষয় নয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তি মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বদলে যেতে পারে যুদ্ধের কৌশল
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে লেজার অস্ত্র যুদ্ধের কৌশল ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

ব্রেন্ট জিয়ারনিকের মতে, সলিড-স্টেট লেজারে চলমান যন্ত্রাংশের সংখ্যা খুব কম। পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করা গেলে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ মজুতের প্রয়োজন কমে যেতে পারে এবং সামরিক রসদ ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।

মার্ক নাইস বলেন, লেজারের শক্তি ও পাল্লা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও উন্নত ও প্রাণঘাতী হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে।

তবে এখনই কাঁধে বহনযোগ্য লেজার অস্ত্র বা বাজুকার মতো কোনো ব্যবস্থা নিয়ে সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে নামার সম্ভাবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা লেজার সিস্টেমগুলো আকারে বড় ও ভারী। এ কারণে এগুলো যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করতে হয়।

এসব ব্যবস্থার আকৃতি অনেকটা গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরার মতো। এগুলোকে বলা হয় ‘হাই-এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স’।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থায় ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার উচ্চশক্তির লেজার ব্যবহার করা হয়। এই লেজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বেশিরভাগ ভিডিওতে ছোট আকারের ড্রোনের ওপর লেজার অস্ত্রের পরীক্ষা বা ব্যবহার দেখা গেছে। তবে বোয়িং সম্প্রতি ‘কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম’ নামে একটি নতুন ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি ১ হাজার ৩০০ পাউন্ড বা প্রায় ৫৯০ কেজি ওজনের ‘গ্রুপ-৩’ শ্রেণির ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম।

লেজার অস্ত্রের প্রদর্শনীতে পিট হেগসেথ
লেজার অস্ত্রের এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথও।

জ্যারেড কেলার জানান, জুনে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে লেজার অস্ত্রের একটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন হেগসেথ। সেখানে হাতে কন্ট্রোলার নিয়ে কয়েক মিনিট প্রশিক্ষণের পর তিনি একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হন বলে কেলারের দাবি।

তবে শক্তিশালী এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। লেজার অস্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পরিষ্কার আকাশ প্রয়োজন। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বিত হামলা বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এর সক্ষমতা সীমিত।

মহাকাশেও কি পৌঁছাবে লেজার অস্ত্র?
পৃথিবীর যুদ্ধক্ষেত্রের পর ভবিষ্যতে মহাকাশেও লেজার অস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন স্পেস ফোর্স পৃথিবীর কক্ষপথে সক্রিয় অস্ত্র মোতায়েনের কথা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে। ওই ব্যবস্থায় লেজার প্রযুক্তি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে শুরুতে মন্তব্য করতে চাননি মার্ক নাইস।

তবে মহাকাশে ভবিষ্যতে লেজার অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই।’

কেলারের মতে, পরীক্ষাগার থেকে লেজার প্রযুক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ‘স্টার ওয়ার্স’ কর্মসূচির সময়ের পর আর দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘লেজার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও অভিহিত করার কথা বলেন।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লেজার প্রযুক্তির অস্ত্র মোতায়েন, সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশের সময় : ০৮:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালিতে অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী এসব অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৫০ কোটি ডলারের প্রকল্পও হাতে নিয়েছে দেশটি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে লেজার প্রযুক্তি।

সম্প্রতি ইরানের আকাশে চোখধাঁধানো লেজার আলোর দৃশ্য দেখা গেছে। এগুলো কোনো বিনোদনমূলক আলোকসজ্জা নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ধ্বংস করছে বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।

যুক্তরাষ্ট্রের লেজার অস্ত্র উন্নয়নের কর্মসূচি প্রায় পাঁচ দশকের পুরোনো। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্ষমতার বিচারে এসব ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক এগিয়ে।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের প্রেসিডেন্ট মার্ক নাইস দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেন, নির্দিষ্টভাবে ড্রোন শনাক্ত করে সেটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যায়। এরপর লেজার রশ্মি প্রয়োজনীয় স্থানে কেন্দ্রীভূত করে ড্রোনের সেন্সর অকার্যকর করা কিংবা পুরো ড্রোন ধ্বংস করা সম্ভব।

যেভাবে কাজ করে লেজার অস্ত্র
লেজার অস্ত্রে জেনারেটর বা ব্যাটারি থেকে পাওয়া শক্তিকে ফোটনে রূপান্তর করা হয়। পরে ওই ফোটনগুলোকে একটি শক্তিশালী একক রশ্মিতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। সাধারণত খালি চোখে এই রশ্মি দেখা যায় না; ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা সম্ভব।

লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট একটি অংশে নির্দিষ্ট সময় ধরে লেজার রশ্মি স্থির রাখা হয়। এতে সেখানে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়। ফলে লক্ষ্যবস্তু গলে যেতে পারে কিংবা বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হতে পারে।

লেজার যুদ্ধবিষয়ক নিউজলেটার ‘লেজার ওয়ার্স’-এর লেখক জ্যারেড কেলার বলেন, এটি মূলত আলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি। কোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে কয়েক সেকেন্ড ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় লেজার রশ্মি ধরে রাখতে হয়।

তার মতে, পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের সময় এসেছে। তিনি বিশেষভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রায় ৫০ কোটি ডলারের চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যার আওতায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত লেজার অস্ত্র তৈরি করা হবে। এসব অস্ত্রে ফোটনকে লক্ষ্যবস্তুর ওপর কেন্দ্রীভূত করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হবে।

এক্সবক্স কন্ট্রোলার দিয়ে চালানো হচ্ছে লেজার অস্ত্র
অত্যাধুনিক এই সামরিক প্রযুক্তির কিছু ব্যবস্থা পরিচালনায় মার্কিন সেনারা পুনর্বিন্যাস করা এক্সবক্স গেম কনসোলের কন্ট্রোলার ব্যবহার করছেন।

কেলারের ব্যাখ্যা, ভিডিও গেম শিল্প বহু গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর কন্ট্রোলার তৈরি করেছে। তাই সামরিক বাহিনীও মনে করছে, একই ধরনের কন্ট্রোলার দিয়ে যদি কাজটি করা সম্ভব হয়, তাহলে আলাদা করে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন নেই।

এমনকি ‘হ্যালো’ গেমে স্পার্টান লেজার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থাকা কেউ বাস্তব জীবনের এ ধরনের অস্ত্রও পরিচালনা করতে পারবেন—এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।

মেক্সিকোর মাদক চক্রের ড্রোনেও প্রযুক্তির পরীক্ষা
লেজার প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তের মাদক চক্রগুলোর ড্রোনও পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। মাদক কারবারিদের পাঠানো ড্রোন ধ্বংস করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডার প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করছে। এখন পর্যন্ত লেজার ব্যবহার করে অন্তত ১১টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আমেরিকান ফরেন পলিসি কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রেন্ট জিয়ারনিক বলেন, মাদক চক্রের হুমকি কমাতে বা তাদের কার্যক্রমে বাধা দিতে যেসব ব্যবস্থা কার্যকর, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লেজার দিয়ে ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা এখন আর কেবল কল্পনার বিষয় নয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তি মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বদলে যেতে পারে যুদ্ধের কৌশল
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে লেজার অস্ত্র যুদ্ধের কৌশল ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

ব্রেন্ট জিয়ারনিকের মতে, সলিড-স্টেট লেজারে চলমান যন্ত্রাংশের সংখ্যা খুব কম। পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করা গেলে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ মজুতের প্রয়োজন কমে যেতে পারে এবং সামরিক রসদ ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।

মার্ক নাইস বলেন, লেজারের শক্তি ও পাল্লা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও উন্নত ও প্রাণঘাতী হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়বে।

তবে এখনই কাঁধে বহনযোগ্য লেজার অস্ত্র বা বাজুকার মতো কোনো ব্যবস্থা নিয়ে সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে নামার সম্ভাবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা লেজার সিস্টেমগুলো আকারে বড় ও ভারী। এ কারণে এগুলো যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করতে হয়।

এসব ব্যবস্থার আকৃতি অনেকটা গতিসীমা শনাক্তকারী ক্যামেরার মতো। এগুলোকে বলা হয় ‘হাই-এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স’।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থায় ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার উচ্চশক্তির লেজার ব্যবহার করা হয়। এই লেজার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বেশিরভাগ ভিডিওতে ছোট আকারের ড্রোনের ওপর লেজার অস্ত্রের পরীক্ষা বা ব্যবহার দেখা গেছে। তবে বোয়িং সম্প্রতি ‘কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম’ নামে একটি নতুন ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি ১ হাজার ৩০০ পাউন্ড বা প্রায় ৫৯০ কেজি ওজনের ‘গ্রুপ-৩’ শ্রেণির ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম।

লেজার অস্ত্রের প্রদর্শনীতে পিট হেগসেথ
লেজার অস্ত্রের এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথও।

জ্যারেড কেলার জানান, জুনে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে লেজার অস্ত্রের একটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন হেগসেথ। সেখানে হাতে কন্ট্রোলার নিয়ে কয়েক মিনিট প্রশিক্ষণের পর তিনি একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হন বলে কেলারের দাবি।

তবে শক্তিশালী এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। লেজার অস্ত্র কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য পরিষ্কার আকাশ প্রয়োজন। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সমন্বিত হামলা বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এর সক্ষমতা সীমিত।

মহাকাশেও কি পৌঁছাবে লেজার অস্ত্র?
পৃথিবীর যুদ্ধক্ষেত্রের পর ভবিষ্যতে মহাকাশেও লেজার অস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন স্পেস ফোর্স পৃথিবীর কক্ষপথে সক্রিয় অস্ত্র মোতায়েনের কথা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে। ওই ব্যবস্থায় লেজার প্রযুক্তি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে শুরুতে মন্তব্য করতে চাননি মার্ক নাইস।

তবে মহাকাশে ভবিষ্যতে লেজার অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই।’

কেলারের মতে, পরীক্ষাগার থেকে লেজার প্রযুক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ‘স্টার ওয়ার্স’ কর্মসূচির সময়ের পর আর দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘লেজার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও অভিহিত করার কথা বলেন।