বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা, আতঙ্কে মানিক পশারীর স্বজনেরা; নেই পুলিশি পাহারা নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন বৃহস্পতিবার সাড়ে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় প্রথম স্ত্রীকে রেখে শ্যালিকাকে বিয়ে, দেশজুড়ে সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত তালাক উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী-দেশবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নওগাঁয় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গসহ আটক ১ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে: হান্নান মাসউদ ১০ জানুয়ারি শুরু জাবির ভর্তি পরীক্ষা, চলবে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত গণভোটের রায় অমান্য করলে সরকারকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে: মঞ্জু

মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা, আতঙ্কে মানিক পশারীর স্বজনেরা; নেই পুলিশি পাহারা

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৮:১২:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 3

পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার পরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁর স্বজনেরা। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দাফনের জন্য খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয় এবং কবর খননে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখানো হয়। পরে গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় তাঁকে দাফন করা হলেও বর্তমানে বাড়িতে কোনো পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।

স্বজনদের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের বাধার মুখে মানিক পশারীর শেষবিদায় ঘিরে দিনভর উত্তেজনা তৈরি হয়। লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারও মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়া কিংবা খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার মতো ঘটনা তাঁদের এলাকায় আগে ঘটেনি।

মানিক পশারী শনিবার সকালে তাঁর মেয়ে আফরোজা পশারীর গোপালগঞ্জের বাড়িতে মারা যান। দুপুরের দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা জড়ো হয়ে মিছিল করেন। তাঁরা মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে স্লোগান দেন এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার দাবি জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও দাফনে বাধা দেওয়ার আশঙ্কায় মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনস মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পর গভীর রাতে বিকল্প সড়ক দিয়ে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে পুলিশি পাহারায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহ পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিয়ে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সংঘাত, সহিংসতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কিছু কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল রাজ্জাক, পৌর জামায়াতের আমির ইসহাক আলী এবং জিয়ানগর উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক শিবির নেতা মামুন হোসাইন। গ্রামের বাড়িতে খোঁড়া কবর ভরাট করে দেওয়া এবং কবরের জন্য আনা বাঁশ সরিয়ে ফেলার ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মুইন উদ্দিনের নেতৃত্বে লোকজনের অংশ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে আব্দুল রাজ্জাক বলেছিলেন, তাঁরা দাফনে বাধা দেবেন না; তবে মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করছেন। পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার না দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তাঁরা। প্রশাসন তাঁকে সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বলে জানালে আর বাধা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পরে তাঁরা দাফনে সহযোগিতা করেছেন।

অন্যদিকে, মুইন উদ্দিন বলেন, তিনি লোকজন নিয়ে মানিক পশারীর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে মিছিল করেছেন। তবে খোঁড়া কবরে মাটি ফেলে ভরাট করার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

আতঙ্কে স্বজনেরা

পিরোজপুর শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়ি। দাফনের পর রাতেই তাঁর মেয়ে ও পুত্রবধূ সন্তানদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। বাড়িতে গিয়ে তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। আশপাশের কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারাও এ ঘটনা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

পরে মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর ভাইয়ের বাড়ির একটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। ওই রাতেই ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতারা আগুন দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমানে পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা এবং মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন হেনা পশারী।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের পাকা ভিটা খালি পড়ে আছে। স্বজনেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাদে শ্যাম সরকার বলেন, টহল পুলিশকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। তারা মাঝেমধ্যে সেখানে যাচ্ছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পশারীর চাচা রইসউদ্দিন পশারীর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে মানিক পশারীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তাঁর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার আরেক সাক্ষী জলিল শেখের বাড়িও চিতলিয়া গ্রামে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান। ওই রাতেই পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান জলিল শেখ; এরপর আর ফেরেননি।

খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট

মানিক পশারীর মৃত্যুর খবর গ্রামের স্বজনেরা শনিবার সকাল ৯টার দিকে জানতে পারেন। তাঁর ভাগনে আজিজুল ইসলাম জানান, মরদেহ গ্রামে আনলে ঝামেলা হতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করেছিলেন তাঁরা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে গোপালগঞ্জেই দাফনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা মরদেহ গ্রামে নিয়ে আসেন।

আজিজুল ইসলাম স্বজনদের নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে কবর খনন করেন। তাঁর ভাষ্য, এ সময় স্থানীয় কয়েকজন এসে জানান, কবর খননকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। এ কথা শুনে ভয়ে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাগরিবের নামাজের পর সাত থেকে আটটি মোটরসাইকেলে লোকজন মানিক পশারীর বাড়ির সামনে আসেন। কিছুক্ষণ পর শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হয়ে মিছিল করেন। এ সময় মানিক পশারীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়া হয়। একপর্যায়ে মিছিল থেকে কয়েকজন খোঁড়া কবরে মাটি ফেলে ভরাট করে দেন এবং কবরের পাশে রাখা বাঁশ সরিয়ে ফেলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রাত সাড়ে ১০টার দিকে গ্রাম পুলিশের দুই সদস্য এসে আবার কবর খননের কথা বলেন। কিন্তু উপস্থিত পুরুষদের কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি। পরে মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী ও তিন নারী প্রতিবেশী রিয়াজকে সঙ্গে নিয়ে কবর থেকে মাটি সরান। এরপর রাত দেড়টার দিকে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়।

দাফনে বাধা, কবর ভরাট এবং স্বজনদের নিরাপত্তাহীনতার এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে তাঁরা আবারও হয়রানি বা হামলার শিকার হতে পারেন।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা, আতঙ্কে মানিক পশারীর স্বজনেরা; নেই পুলিশি পাহারা

প্রকাশের সময় : ০৮:১২:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার পরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁর স্বজনেরা। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দাফনের জন্য খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয় এবং কবর খননে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার ভয় দেখানো হয়। পরে গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় তাঁকে দাফন করা হলেও বর্তমানে বাড়িতে কোনো পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।

স্বজনদের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের বাধার মুখে মানিক পশারীর শেষবিদায় ঘিরে দিনভর উত্তেজনা তৈরি হয়। লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারও মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়া কিংবা খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার মতো ঘটনা তাঁদের এলাকায় আগে ঘটেনি।

মানিক পশারী শনিবার সকালে তাঁর মেয়ে আফরোজা পশারীর গোপালগঞ্জের বাড়িতে মারা যান। দুপুরের দিকে অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা জড়ো হয়ে মিছিল করেন। তাঁরা মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে স্লোগান দেন এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার দাবি জানান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও দাফনে বাধা দেওয়ার আশঙ্কায় মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনস মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পর গভীর রাতে বিকল্প সড়ক দিয়ে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে পুলিশি পাহারায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহ পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিয়ে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সংঘাত, সহিংসতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কিছু কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল রাজ্জাক, পৌর জামায়াতের আমির ইসহাক আলী এবং জিয়ানগর উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক শিবির নেতা মামুন হোসাইন। গ্রামের বাড়িতে খোঁড়া কবর ভরাট করে দেওয়া এবং কবরের জন্য আনা বাঁশ সরিয়ে ফেলার ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মুইন উদ্দিনের নেতৃত্বে লোকজনের অংশ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে আব্দুল রাজ্জাক বলেছিলেন, তাঁরা দাফনে বাধা দেবেন না; তবে মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করছেন। পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার না দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তাঁরা। প্রশাসন তাঁকে সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বলে জানালে আর বাধা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পরে তাঁরা দাফনে সহযোগিতা করেছেন।

অন্যদিকে, মুইন উদ্দিন বলেন, তিনি লোকজন নিয়ে মানিক পশারীর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে মিছিল করেছেন। তবে খোঁড়া কবরে মাটি ফেলে ভরাট করার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

আতঙ্কে স্বজনেরা

পিরোজপুর শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়ি। দাফনের পর রাতেই তাঁর মেয়ে ও পুত্রবধূ সন্তানদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান। বাড়িতে গিয়ে তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। আশপাশের কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারাও এ ঘটনা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

পরে মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর ভাইয়ের বাড়ির একটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। ওই রাতেই ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতারা আগুন দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমানে পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা এবং মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন হেনা পশারী।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের পাকা ভিটা খালি পড়ে আছে। স্বজনেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাদে শ্যাম সরকার বলেন, টহল পুলিশকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। তারা মাঝেমধ্যে সেখানে যাচ্ছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পশারীর চাচা রইসউদ্দিন পশারীর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালে মানিক পশারীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তাঁর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার আরেক সাক্ষী জলিল শেখের বাড়িও চিতলিয়া গ্রামে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁর দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান। ওই রাতেই পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান জলিল শেখ; এরপর আর ফেরেননি।

খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট

মানিক পশারীর মৃত্যুর খবর গ্রামের স্বজনেরা শনিবার সকাল ৯টার দিকে জানতে পারেন। তাঁর ভাগনে আজিজুল ইসলাম জানান, মরদেহ গ্রামে আনলে ঝামেলা হতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করেছিলেন তাঁরা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে গোপালগঞ্জেই দাফনের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা মরদেহ গ্রামে নিয়ে আসেন।

আজিজুল ইসলাম স্বজনদের নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে কবর খনন করেন। তাঁর ভাষ্য, এ সময় স্থানীয় কয়েকজন এসে জানান, কবর খননকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। এ কথা শুনে ভয়ে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাগরিবের নামাজের পর সাত থেকে আটটি মোটরসাইকেলে লোকজন মানিক পশারীর বাড়ির সামনে আসেন। কিছুক্ষণ পর শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হয়ে মিছিল করেন। এ সময় মানিক পশারীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়া হয়। একপর্যায়ে মিছিল থেকে কয়েকজন খোঁড়া কবরে মাটি ফেলে ভরাট করে দেন এবং কবরের পাশে রাখা বাঁশ সরিয়ে ফেলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রাত সাড়ে ১০টার দিকে গ্রাম পুলিশের দুই সদস্য এসে আবার কবর খননের কথা বলেন। কিন্তু উপস্থিত পুরুষদের কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি। পরে মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী ও তিন নারী প্রতিবেশী রিয়াজকে সঙ্গে নিয়ে কবর থেকে মাটি সরান। এরপর রাত দেড়টার দিকে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়।

দাফনে বাধা, কবর ভরাট এবং স্বজনদের নিরাপত্তাহীনতার এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে তাঁরা আবারও হয়রানি বা হামলার শিকার হতে পারেন।