৪৪ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার, গুরুত্ব পাবেন বিএনপির ত্যাগীরা

- প্রকাশের সময় : ১১:৩৯:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
- / 15

দীর্ঘ ৪৪ বছর পর দেশে আবারও চালু হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সবকিছু ঠিক থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার গঠিত হবে। এর মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। এতে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৬৮টি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ১১২টি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠিত হলে প্রায় সাত লাখ মানুষ এ ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন। স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যা সমাধান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই হবে এর প্রধান লক্ষ্য।
বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের গ্রাম সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন না পাওয়া যোগ্য নেতাকর্মীরাও সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান কালবেলাকে জানিয়েছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জানিয়েছেন, জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রাম সরকারের দায়িত্ব পালন করা জীবিত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণেও তাঁদের যুক্ত করা হতে পারে। পাশাপাশি সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে আগ্রহী নতুন নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।
যেভাবে গঠিত হবে গ্রাম সরকার
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সাধারণ সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হবেন গ্রাম সরকারপ্রধান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য থাকবেন উপদেষ্টা। সাধারণ সদস্যদের মধ্যে সমাজসেবক, কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পেশাজীবী, পল্লী চিকিৎসক, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি থাকবেন।
সদস্যরা সরাসরি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন না। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে তাঁদের বাছাই করা হবে। তবে সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের হ্যাঁ বা না ভোটের বিধান রাখা হয়েছে।
গ্রাম সরকার ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে। কোনো গ্রাম সরকার বাতিল হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের বিধান রয়েছে।
স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা
গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়ন, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং মাদক, সন্ত্রাস, চুরি ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবে গ্রাম সরকার। পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণে সহায়তা এবং সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখবে এ প্রতিষ্ঠান।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৬৮ হাজার গ্রামে এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়। তবে ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তা বিলুপ্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে বিএনপি সরকার গ্রাম সরকার আইন প্রণয়ন করলেও ২০০৫ সালে হাইকোর্ট তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি আইনগতভাবে বাতিল হয়।
গত ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনরায় চালুর প্রস্তাব ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় নতুন আইনের খসড়া প্রস্তুত করে মতামতের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর গ্রাম সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।


















