স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা
শিক্ষকদের নিয়ে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
- প্রকাশের সময় : ১১:৫৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 2
এমপিওভুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রাখা না রাখা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী স্পষ্টত ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি দল বিএনপি ইসির এই উদ্যোগের বিপক্ষে না থাকলেও বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের জোট
১১-দলীয় ঐক্য সাংবিধানিক এ সংস্থাটির কঠোর সমালোচনা করছে।
স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তর-সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে একাধিক সংশোধনের সুপারিশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বাতিলের প্রস্তাবটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা ইসির প্রস্তাবের পক্ষে মতামত দিয়েছেন।
ইসির প্রস্তাব অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক চাকরিতে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইসি বলছে, একই সঙ্গে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক চাকরি এবং জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা বিষয়ে ইসির প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অবশ্যই প্রস্তাব ঠিক আছে। আপনি সরকারি পয়সাও নেবেন, তারপর আপনি ইলেকশন করবেন! এটা তো হয় না! এটা একদম একসেপ্টেবল না।
জামায়াতের আপত্তি : জামায়াতে ইসলামী গত ২৯ জুলাই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানায়। ১ সেপ্টেম্বরও সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে দলটি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল এ প্রস্তাবকে অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক বলে মন্তব্য করে বলেন, সুদীর্ঘকাল থেকে বাংলাদেশে সব নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারে, রাজনীতি করতে পারে, ভোট দিতে পারে। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমপিওভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। রহস্যজনক কারণে কমিশন নিজেরাই একটা বৈঠক করে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছেন যে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ইসির এমন সুপারিশ অসাংবিধানিক।
ভিন্ন অবস্থানে বিএনপি : জামায়াতের বিপরীতে বিএনপির অবস্থান এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হলে তারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। আবার পেশাগত দায়িত্বও সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন না। তাই ইসির প্রস্তাব সঠিক রয়েছে।
একজন নির্বাচন বিশ্লেষক বলেছেন, শিক্ষকদের একটি অংশের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রার্থিতার প্রশ্নটি নিছক নির্বাচন আইন সংশোধনের বিষয় না থেকে দলীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
ইসির আইন সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনের বাইরে কিছু বলতে পারব না। আইন এমন হলে আইন মেনেই কাজ করতে হবে।
ইসির যুক্তি, সিদ্ধান্ত সংসদে : এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবের বিষয়ে ইসি বলছে, সার্বক্ষণিক চাকরিতে থাকা ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ইসি নিজে আইন পরিবর্তন করতে পারে না। কমিশন কেবল সংশোধনের সুপারিশ করতে পারে। ইসির সুপারিশ সরকার গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদেই এর চূড়ান্ত অনুমোদন হবে।
আইন সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করেন। এ অবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ভোটে অংশ নিলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেই নির্বাচন কমিশন আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজ হচ্ছে একটা নিরপেক্ষ, সুন্দর সুষ্ঠু বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচনটা উঠিয়ে আনা। যারা শিক্ষকতা করছেন তারা সবার সম্মানিত ব্যক্তি। তারা যাতে বিতর্কিত না হন। তাদের মধ্যে কেউ ইলেকশনে দাঁড়ালেন, আবার তাদের সহকর্মীদেরকেই প্রিসাইডিং, পোলিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ করতে হচ্ছে। অপরপক্ষ বলবে যে তারা তো নিরপেক্ষ না। সে কারণেই নির্বাচন কমিশনের অবজারভেশন হচ্ছে- তাদের ভোটের বাইরে রাখা। জামায়াত বলছে, রহস্যজনক কারণে কমিশন নিজেরাই সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছে। ইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না, কমিশনকে অসহায় মনে হচ্ছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আমি চাপে আছি, নাকি স্বাধীন আছি এটা তো আমি জানি। বরং এ কথা বলে আমাদেরকে চাপে রাখারই তো একটা ফর্মুলা আমি মনে করি। কারণ আমরা যেটা করি না, নির্বাচন কমিশন যেভাবে কাজ করে না সেটা যদি আপনি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন সেটাও সঠিক না।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন




















