বিশ্ব হাতি দিবস আজ: আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব
- প্রকাশের সময় : ০৯:১০:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
- / 15
আজ ১২ আগস্ট, বিশ্ব হাতি দিবস। হাতির বিলুপ্তি রোধ, সুরক্ষা এবং আবাসস্থল সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।’
বাংলাদেশে হাতির আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হওয়ায় বাড়ছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বন ও শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন দখল করে বসতি স্থাপন, নির্বিচারে গাছ কাটা, খাদ্যসংকট এবং হাতির চলাচলের করিডর নষ্ট হওয়ার কারণে লোকালয়ে হাতির বিচরণ বেড়েছে।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আবদুর রহমান একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে জোয়ারের পানিতে বছরে তিন-চারবার ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় দুই বছর আগে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েন তিনি। স্থান বদলের সঙ্গে বদলেছে তাঁর পেশাও। এখন বনমুখী জীবনযাপন করেই ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন।
একইভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় পশ্চিম বড়ঘোনার মনসুর আলমও চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েছেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর পূর্ব জঙ্গল চাম্বল এলাকায় সংরক্ষিত বনে এমন অন্তত ৮০টি পরিবারের বসতি রয়েছে। পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর এলাকাতেও বনভূমিতে বসতি গড়েছেন জলবায়ু উদ্বাস্তুরা।
পরিবেশবাদীদের মতে, সংরক্ষিত বনে মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাতির আবাসস্থল। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হাতির চলাচলের পথ। সংকুচিত হচ্ছে বিচরণক্ষেত্র। বনভূমিতে খাদ্যযোগ্য গাছপালা ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করায় হাতির খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে।
প্রায় ১৯ হাজার একর আয়তনের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের প্রায় অর্ধেকই বাঁশখালী উপজেলায়। এ অভয়ারণ্যের দুটি রেঞ্জ ও সাতটি বিটের মধ্যে একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট বাঁশখালীতে। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতির চলাচলের করিডর।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১০২টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে মারা গেছে ১৪টি। বিশ্বজুড়ে হাতি বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় থাকলেও বাংলাদেশে এটি মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের বন অধিদপ্তর ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (আইইউসিএন) বলছে, হাতি-মানুষের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’ ধ্বংস হওয়া। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
দেশে হাতি নিয়ে সরকারি উদ্যোগে তিনটি জরিপ হয়েছে—১৯৮০, ২০০০ ও ২০১৬ সালে। বন বিভাগের প্রথম জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ৩৮০টি। ২০০০ সালের জরিপে পাওয়া যায় ২৩৯টি হাতি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জরিপে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৮টিতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সংরক্ষিত বনে বসতি স্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। পূর্ব জঙ্গল চাম্বল সংরক্ষিত বনে ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার বসতি স্থাপন করেছে বলে স্থানীয়রা জানান। এসব পরিবার বনের প্রায় ২০ একর জায়গা দখল করেছে বলেও তাঁদের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করলেও আগে হাতির আক্রমণের শিকার হতে হয়নি। কয়েক বছর ধরে চাষাবাদে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যহাতি। গত সপ্তাহেও রাতে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট করেছে।
আরেক বাসিন্দা ফজল কাদের বলেন, ‘হাতি এলে শিস দিয়ে সবাইকে এক করা হয়। এরপর আগুন জ্বেলে গহিন বনের দিকে হাতির পালকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।’
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার অনেকে বনের জমিতে বসতি স্থাপন করছেন। হাতির আবাসস্থল রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে।
বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী মনিরা পারভিন বলেন, কয়েক বছর ধরে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব বেড়েছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এতে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে পাহাড়ে মানুষের পুনর্বাসন চলতে থাকলে হাতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, হাতির আবাসস্থল হচ্ছে বনাঞ্চল। বনের পরিবেশের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসবে। হাতিকে নিরাপদ রাখতে হলে পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে।
গারো পাহাড়ে হাতি বেড়েছে, বেড়েছে ঝুঁকিও
শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলেও বাড়ছে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। অবাধে গাছ কাটা, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন ও বন দখল করে বসতি স্থাপনের কারণে বনে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডারও কমেছে। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতি প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে।
তবে বন বিভাগ বলছে, গারো পাহাড়ে বন্যহাতির সংখ্যা বেড়েছে। গত তিন বছরে অন্তত ৫৫টি হাতির শাবক জন্মেছে বলে তাদের ধারণা। আগে গারো পাহাড়ে ১০০ থেকে ১২০টি বন্যহাতির বিচরণ দেখা গেলেও বর্তমানে এ সংখ্যা ১৮০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে।
বন কর্মকর্তাদের মতে, গারো পাহাড়ে হাতির বংশবিস্তার আশার আলো দেখাচ্ছে। সম্প্রতি ড্রোন ক্যামেরায় বনের ভেতর ৩৪টি হাতির একটি পালে ৮ থেকে ১০টি শাবক দেখা গেছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বালিজুরি রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি রক্ষায় শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ঠেকানো নয়, বরং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর সুরক্ষিত করা জরুরি। বন ও হাতির আবাসস্থল রক্ষা করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য টিকবে, অন্যদিকে কমবে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাতও।
























