Dhaka ০১:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

দেশের সব দুধে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক: শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ০১:০৬:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / 10

বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত দুধ ও নানা ধরনের দুগ্ধজাত পণ্যে বিষাক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় পরীক্ষা করা ৪১টি নমুনার **প্রতিটিতেই (১০০%)** মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেটজাত ও গুঁড়া দুধে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানে সম্পন্ন হওয়া এই গবেষণাটি দেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রথম বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা।

গবেষণায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন গবেষক সানাউল্লাহ মাজুমদার। গবেষক দলে আরও ছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম ও মো. ওমর ফারুক।

কণার পরিমাণ ও ব্র্যান্ডের দুধের চিত্র

গবেষক দলটি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত (ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রাম) থেকে ১৭টি কাঁচা দুধের নমুনা এবং বাজার ও সুপারশপ থেকে ১২টি ব্র্যান্ডের দুধ ও ১২টি দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। মাইক্রোস্কোপ এবং ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (FTIR) প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিকের ধরন পরীক্ষা করে দেখা যায়:

ব্র্যান্ডের দুধে: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ১৫৬.০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা উপস্থিত।
কাঁচা দুধে:প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩.৩৯টি কণা।
অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৭০.৮০টি কণা।

গবেষকদের মতে, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, কারখানা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পরিবহন, ফিল্টারিং, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, পাইপলাইন, বোতলজাতকরণ, কর্মীদের গ্লাভস ও পোশাক এবং কারখানার ভেতরের বাতাস থেকে ব্র্যান্ডের দুধে অতিরিক্ত প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়ছে।

কণার ধরন ও পলিমারের উপস্থিতি

গবেষণায় দেখা গেছে, দুধে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের সিংহভাগই **স্বচ্ছ ও আঁশের মতো (ফাইবার)** এবং এদের আকার ২৫০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে কম। কাঁচা দুধে প্রায় ৭৭.৪৮% এবং ব্র্যান্ডের দুধে ৮২.৮৩% কণাই ছিল আঁশ আকৃতির।

নমুনাগুলোতে বিষাক্ত বিভিন্ন পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে—

কাঁচা দুধে প্রাধান্য: পিটিএফই (টেফলন) ও পিইটি (PET)।
ব্র্যান্ডের দুধে প্রাধান্য: পিটিএফই, পিডিএমএস ও পিইটি।
দুগ্ধজাত পণ্যে প্রাধান্য: পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিপিএস।

শিশুদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, শরীরের ওজন এবং প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণের হার বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে **শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেক বেশি**। বিশেষ করে **৪ থেকে ১০ বছর বয়সী** যে শিশুরা ব্র্যান্ডের দুধ পান করে, তাদের শরীরে এই ক্ষতিকর কণা প্রবেশের মাত্রা সর্বোচ্চ।

এছাড়া পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি সূচকে কাঁচা দুধে কণার সংখ্যা কম থাকলেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে এটি ‘উচ্চ ঝুঁকি’ শ্রেণিতে পড়েছে। অন্যদিকে ব্র্যান্ডের দুধ ‘উল্লেখযোগ্য’ এবং দুগ্ধজাত পণ্য ‘মাঝারি’ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

করণীয় ও সুপারিশ

বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে একটি উদীয়মান ও মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তা সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। এটি প্রতিরোধে তারা কয়েকটি জরুরি সুপারিশ করেছেন:

১. দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

২. প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উচ্চমানের ও উন্নত ফিল্টার ব্যবস্থার প্রচলন করা।

৩. কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী বা বিকল্প উপাদানে তৈরি যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইন ব্যবহার করা।

৪. দুগ্ধজাত পণ্যের গুণগত মান ও প্লাস্টিক দূষণ পরিমাপ করতে নিয়মিত সরকারি তদারকি ও ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

দেশের সব দুধে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক: শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

প্রকাশের সময় : ০১:০৬:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত দুধ ও নানা ধরনের দুগ্ধজাত পণ্যে বিষাক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় পরীক্ষা করা ৪১টি নমুনার **প্রতিটিতেই (১০০%)** মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেটজাত ও গুঁড়া দুধে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানে সম্পন্ন হওয়া এই গবেষণাটি দেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রথম বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা।

গবেষণায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন গবেষক সানাউল্লাহ মাজুমদার। গবেষক দলে আরও ছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম ও মো. ওমর ফারুক।

কণার পরিমাণ ও ব্র্যান্ডের দুধের চিত্র

গবেষক দলটি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত (ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রাম) থেকে ১৭টি কাঁচা দুধের নমুনা এবং বাজার ও সুপারশপ থেকে ১২টি ব্র্যান্ডের দুধ ও ১২টি দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। মাইক্রোস্কোপ এবং ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (FTIR) প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিকের ধরন পরীক্ষা করে দেখা যায়:

ব্র্যান্ডের দুধে: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ১৫৬.০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা উপস্থিত।
কাঁচা দুধে:প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩.৩৯টি কণা।
অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৭০.৮০টি কণা।

গবেষকদের মতে, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, কারখানা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পরিবহন, ফিল্টারিং, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, পাইপলাইন, বোতলজাতকরণ, কর্মীদের গ্লাভস ও পোশাক এবং কারখানার ভেতরের বাতাস থেকে ব্র্যান্ডের দুধে অতিরিক্ত প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়ছে।

কণার ধরন ও পলিমারের উপস্থিতি

গবেষণায় দেখা গেছে, দুধে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের সিংহভাগই **স্বচ্ছ ও আঁশের মতো (ফাইবার)** এবং এদের আকার ২৫০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে কম। কাঁচা দুধে প্রায় ৭৭.৪৮% এবং ব্র্যান্ডের দুধে ৮২.৮৩% কণাই ছিল আঁশ আকৃতির।

নমুনাগুলোতে বিষাক্ত বিভিন্ন পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে—

কাঁচা দুধে প্রাধান্য: পিটিএফই (টেফলন) ও পিইটি (PET)।
ব্র্যান্ডের দুধে প্রাধান্য: পিটিএফই, পিডিএমএস ও পিইটি।
দুগ্ধজাত পণ্যে প্রাধান্য: পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিপিএস।

শিশুদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি

গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, শরীরের ওজন এবং প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণের হার বিবেচনায় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে **শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেক বেশি**। বিশেষ করে **৪ থেকে ১০ বছর বয়সী** যে শিশুরা ব্র্যান্ডের দুধ পান করে, তাদের শরীরে এই ক্ষতিকর কণা প্রবেশের মাত্রা সর্বোচ্চ।

এছাড়া পলিমারভিত্তিক ঝুঁকি সূচকে কাঁচা দুধে কণার সংখ্যা কম থাকলেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে এটি ‘উচ্চ ঝুঁকি’ শ্রেণিতে পড়েছে। অন্যদিকে ব্র্যান্ডের দুধ ‘উল্লেখযোগ্য’ এবং দুগ্ধজাত পণ্য ‘মাঝারি’ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

করণীয় ও সুপারিশ

বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে একটি উদীয়মান ও মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তা সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। এটি প্রতিরোধে তারা কয়েকটি জরুরি সুপারিশ করেছেন:

১. দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

২. প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উচ্চমানের ও উন্নত ফিল্টার ব্যবস্থার প্রচলন করা।

৩. কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী বা বিকল্প উপাদানে তৈরি যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইন ব্যবহার করা।

৪. দুগ্ধজাত পণ্যের গুণগত মান ও প্লাস্টিক দূষণ পরিমাপ করতে নিয়মিত সরকারি তদারকি ও ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা।