Dhaka ০৫:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোরের আলোয় শ্রম বিক্রির মেলা, রাণীশংকৈলে ‘মানুষ হাট’-এর গল্প

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
  • প্রকাশের সময় : ০৩:৫৬:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • / 6

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই কাজের সন্ধানে বের হন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন “মানুষ বিক্রির হাট” কিংবা “শ্রম বিক্রির হাট”— যেখানে বিক্রি হয় মানুষের দৈহিক শ্রম আর ঘামে ভেজা জীবনসংগ্রাম।

উপজেলার আমজুয়ান ইউনিয়ন পরিষদ মার্কেট, মাদ্রাসা মোড় ও বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় সকাল হলেই জড়ো হন শ্রমিকরা। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কাজের আশায় শহরমুখী হন।

শ্রমিকদের হাতে থাকে কাস্তে, কোদাল, শাবল, দা কিংবা ডালি। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন তারা। কেউ আসেন দিনমজুরির আশায়, কেউ অপেক্ষা করেন কোনো মালিক এসে ডেকে নেবেন এই প্রত্যাশায়।

বুধবার সকালে বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় কথা হয় রাজমিস্ত্রি আব্দুর রশিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, “অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন এখানে আসি। মালিকরা এখান থেকেই শ্রমিক নিয়ে যান। এতে শ্রমিক ও মালিক— দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়।”

এদিকে কৃষি মৌসুমকে ঘিরে পৌর শহরের মাদ্রাসা মোড়ে কৃষিশ্রমিকদের ভিড় আরও বেড়েছে। বর্তমানে ইরি ধান কাটা ও ভুট্টা ভাঙানোর মৌসুম চলায় শ্রমিকের চাহিদাও কিছুটা বেড়েছে।

সুন্দরপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, “ভোরে বের হই, সারাদিন বসে থাকি। কাজ পেলে আয় হয়, না পেলে খালি হাতেই ফিরতে হয়।”

বাচোর ইউনিয়নের সামশুল হক ও বাসিয়া রায় জানান, তারা দিনভিত্তিক কিংবা চুক্তিভিত্তিক শ্রম বিক্রি করেন। কাজ না পেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বাড়ি ফিরে যেতে হয়।

গুয়াগাঁও গ্রামের ভন্দু রায় বলেন, “দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পাই, তাও নিয়মিত না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি। আমরা যেন হাটে বসে থাকা পণ্যে পরিণত হয়েছি।”

স্থানীয়দের মতে, উত্তরাঞ্চলে শিল্প-কারখানার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে অন্য জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ যাচ্ছেন বগুড়া, কেউ ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা কিংবা ফেনীতে জীবিকার সন্ধানে।

ঢাকায় কর্মরত এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, “এলাকায় কাজ না থাকায় বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানো কঠিন।”

এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা আল্লামা ওয়াদুদ বিন নুর আলিফ বলেন, উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ভোরের আলোয় শ্রম বিক্রির মেলা, রাণীশংকৈলে ‘মানুষ হাট’-এর গল্প

প্রকাশের সময় : ০৩:৫৬:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই কাজের সন্ধানে বের হন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি যেন “মানুষ বিক্রির হাট” কিংবা “শ্রম বিক্রির হাট”— যেখানে বিক্রি হয় মানুষের দৈহিক শ্রম আর ঘামে ভেজা জীবনসংগ্রাম।

উপজেলার আমজুয়ান ইউনিয়ন পরিষদ মার্কেট, মাদ্রাসা মোড় ও বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় সকাল হলেই জড়ো হন শ্রমিকরা। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কাজের আশায় শহরমুখী হন।

শ্রমিকদের হাতে থাকে কাস্তে, কোদাল, শাবল, দা কিংবা ডালি। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন তারা। কেউ আসেন দিনমজুরির আশায়, কেউ অপেক্ষা করেন কোনো মালিক এসে ডেকে নেবেন এই প্রত্যাশায়।

বুধবার সকালে বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় কথা হয় রাজমিস্ত্রি আব্দুর রশিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, “অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন এখানে আসি। মালিকরা এখান থেকেই শ্রমিক নিয়ে যান। এতে শ্রমিক ও মালিক— দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়।”

এদিকে কৃষি মৌসুমকে ঘিরে পৌর শহরের মাদ্রাসা মোড়ে কৃষিশ্রমিকদের ভিড় আরও বেড়েছে। বর্তমানে ইরি ধান কাটা ও ভুট্টা ভাঙানোর মৌসুম চলায় শ্রমিকের চাহিদাও কিছুটা বেড়েছে।

সুন্দরপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, “ভোরে বের হই, সারাদিন বসে থাকি। কাজ পেলে আয় হয়, না পেলে খালি হাতেই ফিরতে হয়।”

বাচোর ইউনিয়নের সামশুল হক ও বাসিয়া রায় জানান, তারা দিনভিত্তিক কিংবা চুক্তিভিত্তিক শ্রম বিক্রি করেন। কাজ না পেলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বাড়ি ফিরে যেতে হয়।

গুয়াগাঁও গ্রামের ভন্দু রায় বলেন, “দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পাই, তাও নিয়মিত না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি। আমরা যেন হাটে বসে থাকা পণ্যে পরিণত হয়েছি।”

স্থানীয়দের মতে, উত্তরাঞ্চলে শিল্প-কারখানার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে অন্য জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ যাচ্ছেন বগুড়া, কেউ ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা কিংবা ফেনীতে জীবিকার সন্ধানে।

ঢাকায় কর্মরত এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, “এলাকায় কাজ না থাকায় বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানো কঠিন।”

এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা আল্লামা ওয়াদুদ বিন নুর আলিফ বলেন, উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।