তথ্য অধিকার : সুশাসনের হাতিয়ার
- প্রকাশের সময় : ০৩:১১:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 206
আগে বলা হতো “জ্ঞানই শক্তি।” মানুষের জীবনে জ্ঞানই পথপ্রদর্শক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি এবং উন্নতির মূল চালিকা শক্তি। তবে দ্রæত পরিবর্তনশীল আধুনিক যুগে তথ্যের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এখন বলা যায়, তথ্যই শক্তি। কারণ সঠিক তথ্যের মাধ্যমে মানুষ আরও সচেতন, আত্মবিশ্বাসী এবং জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যত বেশি তথ্যের অধিকারী, সে তত বেশি ক্ষমতাশালী।
অতীতে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী প্রায়ই তথ্যকে গোপনীয়তার আবরণে আবদ্ধ রাখত, ফলে সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের কর্মকান্ড সম্পর্কে অজ্ঞ থাকত। কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা এবং উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। নাগরিকের জানার অধিকার নিশ্চিত করতেই আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।
২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য :
এই বছর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো “Ensuring Access to Environmental Information in the Digital Age, , যার বাংলা করা হয়েছে “পরিবেশ রক্ষায় ডিজিটাল যুগে তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণ।” পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সঠিক তথ্যের অবাধ প্রবাহ এখন সময়ের দাবি। ভুল, বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর তথ্যের মহাপ্রলয় থেকে বাঁচতে প্রয়োজন তথ্য ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও দক্ষতা।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের সঠিক ব্যবহার রাষ্ট্র ও সমাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে, দুর্নীতি রোধে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন:
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে কার্যকর করা তথ্য অধিকার আইন নাগরিকদের সরকারি ও আধাসরকারি দপ্তর, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও থেকে তথ্য চাওয়ার অধিকার দিয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে সাংবাদিক, গবেষক ও সাধারণ নাগরিকরা তথ্যের মাধ্যমে দুর্নীতি উন্মোচন, সেবা মান উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। আইনের আওতায় প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে—তাদের তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সুরক্ষিত। সাংবাদিকদের জন্য আইনটি এক শক্তিশালী হাতিয়ার, যা দুর্নীতি ও অদক্ষতা প্রকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ :
তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান
অধিকাংশ নাগরিক জানেন না কীভাবে তথ্য চাইতে হয়।
অনেক কর্মকর্তা তথ্য দিতে গড়িমসি করেন, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
প্রশাসনিক জটিলতা আইন প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।
এই কারণে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং তথ্য কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, যাতে আইনটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়।
ভুল তথ্যের হুমকি ও ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ:
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আমাদের জীবন আধুনিক ও সহজ করেছে, তবে একই সঙ্গে অপব্যবহারের হুমকিও তৈরি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও বিকৃত তথ্য। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ ১,৭৯৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০% বেশি। এর মধ্যে
রাজনৈতিক তথ্য: ৪২.০৭%
জাতীয় তথ্য: ২৪.৭২%
আন্তর্জাতিক তথ্য: ১০.৭০%
জুলাই ও আগস্ট মাসেও যথাক্রমে ৩১০ ও ৩২০টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, তথ্যপ্রবাহে ভুলের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, এবং নির্বাচনী সময়ে এটি আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবী।
আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার:
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর অধীনে নাগরিকদের জন্য রয়েছে সুরক্ষামূলক ধারা
২৪ ও ২৫ নম্বর ধারা: ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ক্ষেত্রে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও তথ্য কমিশনে আপিল ও অভিযোগের সুযোগ।
২৭ নম্বর ধারা: তথ্য প্রদানকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান।
অন্যদিকে, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারসহ ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিধান রয়েছে, যা তথ্যের সুরক্ষিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সহায়ক।
নাগরিক সচেতনতা :
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯% হলেও, ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্যের সঠিক ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা কম। দেশে ৫২% পরিবারের ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও বাকি ৪৮% পরিবারের মানুষ অন্যান্যদের ওপর নির্ভরশীল, যাদের মধ্যে সবসময় তথ্যের সত্যতা যাচাই হয় না। ফলে তথ্যের ভুল ব্যবহার এবং বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নাগরিকদের সঠিক তথ্য ব্যবহার, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
টিআইবির ভূমিকা :
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রতিবছর এই দিবস উদযাপন করে নাগরিকদের তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য। জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় র্যালি ও সেমিনার আয়োজন করা হয়। টিআইবি সরকারি ওয়েব পোর্টালগুলো পর্যবেক্ষণ করে। ডিজিটাল যুগে মানুষ ঘরে বসেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে কিনা।
প্রতিবছরের মতো এবারও পোর্টাল স্টাডি সম্পন্ন করে প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।
টিআইবির উদ্যোগে সারা দেশে দুইদিনব্যাপী তথ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বিভিন্ন দপ্তর তাদের অফিসিয়াল তথ্য ও সেবা সাধারণ মানুষের সামনে কীভাবে উন্মুক্ত করা যায় তা প্রদর্শন করে।
তথ্য অধিকার হল সুশাসনের মূল হাতিয়ার এবং নাগরিকের শক্তি।
নাগরিকেরা যদি নিজের তথ্য জানার অধিকার সচেতনভাবে ব্যবহার করে, তবে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। তথ্য অধিকার আইন শুধু আইন নয়, এটি মানুষের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার, সুশাসনের ভিত্তি এবং টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি। আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র নাগরিকের মালিক নয়, বরং নাগরিকই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। মালিকের কাছে সব তথ্য পৌঁছালে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে এবং উন্নয়ন হবে টেকসই।
এই লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর তথ্য অধিকার দিবস পালন করে, যাতে নাগরিকরা তাদের তথ্য অধিকার সচেতনভাবে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং সুশাসনের চর্চা আরও শক্তিশালী হয়।
লেখক : সদস্য, সচেতন নাগরিক কমিটি(সনাক), ফরিদপুর @ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।


























