বদলি-পদায়নে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর ক্ষমতা কমছে
- প্রকাশের সময় : ০২:৩২:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 97
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে প্রধান প্রকৌশলীর ক্ষমতা কমছে। নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে এর ওপরের প্রকৌশলীদের বদলে ক্ষমতা যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হাতে।
এমন নিয়ম রেখে ‘বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০২৫’ করতে যাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এজন্য নীতিমালার খসড়া করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। সবশেষ ২০২৩ সালে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
গণপূর্তের প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বদলির ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলীর বদলি ক্ষমতা রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে ওপরের কর্মকর্তাদের বদলি করছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে এর নিচের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন করতে পারবেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নে নীতিমালার প্রয়োজন। তবে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের হাতে নেওয়ার বিষয়টি ঠিক হবে না। কারণ মাঠ প্রশাসন বা এ ক্ষেত্র সম্পর্কে গণপূর্ত অধিদপ্তর ভালো ধারণা রাখে। কাকে কোথায় দিতে হবে, এটি প্রধান প্রকৌশলীই ভালো জানেন। উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত কর্মকর্তাকে পদায়ন করতে না পারলে, কাজে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা আছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা আনয়ন, সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নে নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই নীতিমালায় বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, শর্তাবলি এবং বদলি সংক্রান্ত অন্য বিষয় সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রকৌশলীদের পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বহুদিনের। তাই নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে এর ওপরের কর্মকর্তাদের পদায়ন-বদলির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা আসবে, অনিয়ম কমবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন অধিশাখা-১) মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘এখন গণপূর্তের প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। অনেক দিন ধরেই একটি নীতিমালা করার চেষ্টা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নীতিমালা হলে শৃঙ্খলা আরও জোরদার হবে বলে আমরা মনে করছি।’
তিনি বলেন, ‘চলতি মাসের মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ করে নীতিমালাটি জারির চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অনেকগুলো মিটিং হয়েছে। খসড়ার বিষয়ে আমরা সবার মতামতও নিয়েছি।’
নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের হাতে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম-সচিব বলেন, ‘যেটা ভালো সবার মতামত নিয়ে সেটাই করা হবে।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) মোহাম্মদ পারভেজ খাদেম বলেন, ‘প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। এটা সবার জন্যই ভালো হবে। এতে বদলি পদায়নের বিষয়টি একটি নিয়মের মধ্যে আসবে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ‘তবে আমরা বলেছি, নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলি-পদায়নের বিষয়টি অধিদপ্তরের হাতে রাখার জন্য। এটাতে কাজের সুবিধা হবে।’
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও এর ওপরের কর্মকর্তা এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও এর নিচের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন করার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হবেন প্রধান প্রকৌশলী।
দশম গ্রেডভুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের প্রধান প্রকৌশলী গণপূর্ত জোনে ন্যস্ত করলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীরা তার আওতাধীন জোনে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদায়ন করতে পারবেন।
প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। এটা সবার জন্যই ভালো হবে। এতে বদলি পদায়নের বিষয়টি একটি নিয়মের মধ্যে আসবে বলে আশা করছি।- গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) মোহাম্মদ পারভেজ খাদেম
কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, সততা, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা ও কাজের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পদায়ন করা হবে। কর্মদক্ষতা নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে গত তিন বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, বিশেষ কারিগরি দক্ষতা/অর্জন, অফিস ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ইত্যাদি বিবেচনা করা হবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, একই কর্মস্থলে কার্যকাল দুই বছর হলে সাধারণত কোনো কর্মকর্তা বদলিযোগ্য হবেন। একই কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তাকে তিন বছরের বেশি নিয়োজিত রাখা যাবে না। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বছরে দুবার ডিসেম্বর/জানুয়ারি ও জুলাই/আগস্টে বদলি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে একই জেলায় একই পদে পরপর দুই মেয়াদে স্বল্পবিরতিতে (কমপক্ষে দুই বছর) পদায়ন করা যাবে না। তবে এক্ষেত্রে সদর দপ্তরে অবস্থিত বিশেষায়িত পদে (যেমন-প্রকল্প প্রণয়ন, কাঠামো/ইলেকট্রিক্যাল/প্লাম্বিং নকশা প্রণয়ন, পিঅ্যান্ডডিসহ বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন ইত্যাদি) কর্মরত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এটি শিথিলযোগ্য।
পার্বত্য এলাকায় যে কোনো কর্মকর্তার চাকরিকাল হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। তবে সমগ্র চাকরি জীবনে মোট চার বছরের বেশি হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে কোন কর্মকর্তার স্ব-প্রণোদিত আবেদনের ভিত্তিতে তাকে পার্বত্য এলাকায় উল্লেখিত সময়ের বেশি সময় পদায়িত রাখা যেতে পারে।
ঢাকা মহানগর ছাড়া দশম গ্রেড থেকে এর ওপরের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ/স্পাউসের জেলায় পদায়ন পরিহার করতে হবে বলে খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, কোনো কর্মকর্তার স্ত্রী বা স্বামী উভয়েই সরকারি চাকরিজীবী হলে একই কর্মস্থলে বা যথাসম্ভব নিকটবর্তী কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
কোনো কর্মকর্তার নিজের বা স্ত্রী/স্বামী/সন্তান/পিতামাতার দুরারোগ্য ব্যাধির সুষ্ঠু চিকিৎসার স্বার্থে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বা কোনো গুরুতর শারীরিক/মানসিক/পারিবারিক সমস্যার কারণে ক্ষেত্রবিশেষে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বদলির আবেদন করা যাবে। যৌক্তিকতা সাপেক্ষে আবেদন বিবেচনার এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের থাকবে।
অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার ছয় মাস আগে কোনো কর্মকর্তা তার সুবিধামতো স্থানে বদলির জন্য আবেদন করলে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওই আবেদন বিবেচনা করা যাবে।
স্বামী/স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হলে, পরিবারের কেউ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ও পিআরএলে যাওয়ার ছয় মাস আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যে কর্মস্থলে পদায়নের আগ্রহ ব্যক্ত করবেন সেই পদে কর্মরত কর্মকর্তার মেয়াদের পূর্ণতা, দক্ষতা, সততা ইত্যাদি বিবেচনার ভিত্তিতে তাকে পদায়নপূর্বক আবেদনকারী কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হবে। তবে এ আবেদন অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা/ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বদলি সংক্রান্ত কোনো সুপারিশ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার পরিপন্থি গণ্য হবে বলে প্রস্তাবিত নীতিমালায় জানানো হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে অফিস হবে ৩ শ্রেণির
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের বিভাগ, উপ-বিভাগ ও শাখা কাজের পরিধি, প্রকৃতি, গুরুত্ব, রাজধানী/বিভাগ/জেলা শহর থেকে দূরত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় তিনটি শ্রেণিতে (ক, খ ও গ) বিন্যাস্ত হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এই শ্রেণিবিন্যাস মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে প্রস্তুত করবেন বলে প্রস্তাবিত নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা, কর্মস্পৃহা ও বিবেচনায় মাঠ পর্যায়ের ক, খ ও গ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা হবে। তবে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি শ্রেণিতে পদায়ন করতে হবে।
কর্মকর্তাদের পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে পদোন্নতির পর প্রথম পর্যায়ে কমপক্ষ দুই বছর খ/গ-শ্রেণির কার্যালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া ক-শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে পরপর দুই মেয়াদে ঢাকা/চট্টগ্রাম মহানগরীর ক-শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না।
মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের জোন/সার্কেল কার্যালয়ে এস্টিমেটর হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হিসেবে ক/খ/গ-শ্রেণির কার্যালয়ে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদে চাকরি করতে হবে।
পদায়নে আরও মানতে হবে যেসব নিয়ম
কোনো কর্মকর্তা বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হলে দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছর ক-শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। তবে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে পদায়ন করতে পারবে।
কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিতে প্রথম যোগদানের পর কমপক্ষে তিন মাস মৌলিক বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না। চাকরির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে মাঠ পর্যায় ও দাপ্তরিক পর্যায়ে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে মাঠপর্যায়ে ও দাপ্তরিক পর্যায়ে পদায়ন করতে হবে।
অন্য মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কর্মকর্তাকে প্রেষণে পদায়ন করা হলে প্রেষণের মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি হবে না।
লিয়েন ও শিক্ষাছুটি থেকে ফেরার পর প্রতি কর্মকর্তাকে মাঠ পর্যায়ে কমপক্ষ দুই বছর চাকরি করতে হবে। তবে বিশেষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত পদে পদায়ন করা যেতে পারে।
খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, বদলির আদেশপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করতে পারবেন না।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছাড়া কাজ বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কার্যালয়গুলো মাঠ পর্যায়ের অফিস নামে অভিহিত হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ডিজাইন, প্রকল্প, পিঅ্যান্ডডি, প্ল্যানিং ইত্যাদি পদগুলো বিশেষায়িত পদ হিসেবে অভিহিত হবে। এ নীতিমালার কোনো অস্পষ্টতার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে বলে খসড়ায় জানানো হয়েছে।





















