সাংবাদিক তুহিন হত্যা : গ্রেপ্তার হওয়া নারী কে এই গোলাপী?
- প্রকাশের সময় : ১০:৫৮:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৫
- / 196
গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। এই হত্যার পেছনে রয়েছে একটি ভয়ঙ্কর ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র। গ্রেপ্তার সাত আসামির মধ্যে রয়েছেন একজন নারী—যিনি পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, জামালপুরের মেলান্দহের বাসিন্দা গোলাপী নামের ওই নারী মূলত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী টার্গেট খুঁজে বের করতেন। তার স্বামী ফয়সাল ওরফে ‘কেটু মিজান’কে এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি)।
২৫ হাজার টাকা দেখে টার্গেট
ঘটনার শুরু গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। গাজীপুর মহানগরীর একটি এটিএম বুথ থেকে পোশাক শ্রমিক বাদশা মিয়া ২৫ হাজার টাকা তুলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাকে নজরে আনেন গোলাপী। এরপর শুরু হয় ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ফাঁদ পাতার পরিকল্পনা।
গোলাপী বাদশাকে কথা বলতে বলতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে ঝগড়া বাঁধে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাদশা মিয়া রেগে গিয়ে গোলাপীকে ঘুষি মারেন। এর পরপরই আগে থেকে ওত পেতে থাকা গোলাপীর স্বামী ফয়সাল ও তার সহযোগীরা চাপাতি নিয়ে বাদশা মিয়ার ওপর হামলা চালায়। তবে প্রাণ বাঁচাতে বাদশা মিয়া দৌড়ে পালিয়ে যান।
সাংবাদিক তুহিনের ভিডিও ধারণই কাল হলো
পুলিশ জানায়, এই হামলার দৃশ্য পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮)। এ দৃশ্য দেখে হামলাকারীরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. জাহিদুল হাসান বলেন, “তুহিনকে ভিডিও মুছে ফেলতে বলা হলেও তিনি রাজি হননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হামলাকারীরা তাকে ধাওয়া করে ঈদগাহ মার্কেটের পাশের একটি মুদির দোকানে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে এবং গলা কেটে হত্যা করে।”
পুলিশি অভিযান ও গ্রেপ্তার
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোট আটজনকে শনাক্ত করে। শনিবার পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—গোলাপী, তার স্বামী ফয়সাল ওরফে কেটু মিজান, সুমন, আল আমিন, স্বাধীন, মো. শাহ জালাল (৩২) এবং মো. ফয়সাল হাসান (২৩)।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, খোলা বাজার ও জনবহুল এলাকায় এভাবে প্রকাশ্যে সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার বার্তা দিচ্ছে। অনেকেই বলেছেন, ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র রাজধানী থেকে শুরু করে আশপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।
সাংবাদিক তুহিনের পরিচয়
তুহিন ছিলেন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুর প্রতিনিধি। তিনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া গ্রামের হাসান জামালের ছেলে। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে গাজীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
ঘটনার পর শুক্রবার সকালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয় শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জুমার নামাজের পর চান্দনা চৌরাস্তার ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাকে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
বিশ্লেষণ: নিরাপত্তা ও সাংবাদিক সুরক্ষা প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ বা ছিনতাই চক্রের ঘটনা নয়—এটি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঝুঁকির প্রকট উদাহরণ। ভিডিও ধারণের মতো একটি মৌলিক অধিকার রক্ষার চেষ্টা করায় একজন সাংবাদিকের জীবন চলে যাওয়া দেশে সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি।






















